People of different ages sitting outdoors, intently using their smartphones, captured in a candid moment.

স্মার্টফোনে আসক্তি? মুক্তি মিলবে কীভাবে?

লাইফস্টাইল






প্রথম আলো ফিচার: স্মার্টফোনে আসক্তি? মুক্তি মিলবে কীভাবে?


স্মার্টফোনে আসক্তি? মুক্তি মিলবে কীভাবে?

আচ্ছা, শেষবার কখন আপনি আপনার ফোনটা পকেট বা ব্যাগে রেখে সারাদিন কাটিয়েছেন? মনে পড়ছে কি? যদি উত্তরটা ‘অনেক দিন’ বা ‘মনে নেই’ হয়, তবে আজকের লেখাটি আপনার জন্যই। ভাবুন তো, আপনার জীবনের কতখানি সময়, কতখানি মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে এই ছোট্ট যন্ত্রটা? একটা সমীক্ষা বলছে, একজন সাধারণ মানুষ দিনে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘন্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। আর যারা বেশি ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়টা ৬-৭ ঘন্টাও ছাড়িয়ে যায়! এই সংখ্যাটা কি আপনাকে একটুও ভাবাচ্ছে?

নোটিফিকেশনের ‘রিল’ বা প্রতিক্রিয়া: এক মায়াবী জগৎ

একটা ছোট্ট রিংটোন, একটা ভাইব্রেশন, অথবা স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটা ছোট্ট লাল বা সবুজ ডট – এই সামান্য শব্দ বা সংকেতগুলোই আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের রাসায়নিক নিঃসরণ ঘটায়, যাকে বলে ডোপামিন। এই ডোপামিনই আমাদের আনন্দ দেয়, তৃপ্তি দেয়। স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনগুলো ঠিক এই কাজটাই করে। ফেসবুকের লাইক, ইনস্টাগ্রামের কমেন্ট, হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ – এগুলো যেন আমাদের জন্য এক অবিরাম ডোপামিন সরবরাহকারী যন্ত্র। এই মায়াবী জগতে এতটাই ডুবে যাই আমরা যে, আসল পৃথিবীর অনেক কিছুই আমাদের কাছে ফিকে মনে হতে শুরু করে।

অরুণিমা, একSohoHost-এর তরুণী গ্রাফিক ডিজাইনার। তার দিন শুরু হয় ফোন চেক করে, আর শেষও হয় ফোন দেখতে দেখতে। সকালে ঘুম ভাঙতেই হাতের কাছে ফোন। “মাত্র পাঁচ মিনিট দেখব,” বলে শুরু করে। কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘন্টায় পরিণত হয়, সে নিজেও জানে না। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে, বন্ধুদের অনলাইন স্ট্যাটাস দেখতে দেখতে, বা কোনো নতুন ট্রেন্ডিং ভিডিও দেখতে দেখতেই তার সকালের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ পড়ে যায়। অফিসে গিয়েও একই অবস্থা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফোন, সহকর্মীদের সাথেও কথা বলার চেয়ে ফোনে ব্যস্ত থাকাটাই যেন তার কাছে বেশি স্বাভাবিক। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও সেই ফোন। চোখের পাতা বন্ধ করার আগ পর্যন্ত স্ক্রিনের নীল আলো তার চোখে মুখে এসে পড়ে। ফলস্বরূপ, রাতের ঘুম প্রায় উধাও। দিনের পর দিন এমন চলতে চলতে অরুণিমা এখন প্রায়শই খিটখিটে হয়ে থাকে, কাজে মনোযোগ দিতে পারে না, এবং নিজের অজান্তেই এক ভয়ংকর ফাঁদে আটকে পড়ছে।

‘স্ক্রল সিনড্রোম’: হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের ছোট ছোট আনন্দ

আমরা সবাই কমবেশি ‘স্ক্রল সিনড্রোম’-এর শিকার। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সামাজিক মাধ্যম বা ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোতে স্ক্রল করে যাওয়া, যেন একপ্রকার নেশা। কিন্তু এই স্ক্রলিংয়ের আড়ালে আমরা কী হারিয়ে ফেলছি জানেন? হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো। পার্কে বসে পাখির ডাক শোনা, প্রিয়জনের সাথে মন খুলে কথা বলা, বা শুধু চুপচাপ বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো সহজ মুহূর্তগুলো। স্মার্টফোন আমাদের সব সময় ‘কানেক্টেড’ থাকতে বলে, কিন্তু আসলে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি নিজেদের থেকে, এবং চারপাশের জগত থেকে।

কল্পনা করুন, আপনি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেছেন। কিন্তু সেখানেও যদি প্রত্যেকে নিজের নিজের ফোনে মগ্ন থাকে, তাহলে সেই আড্ডার মানে কী দাঁড়ায়? অথবা, ধরুন আপনি পরিবারের সাথে রাতের খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু আপনার বা আপনার প্রিয়জনের মনোযোগ যদি ফোন স্ক্রিনে আটকে থাকে, তবে সেই পারিবারিক বন্ধন কতটা দৃঢ় হচ্ছে? এই ‘স্ক্রল সিনড্রোম’ আমাদের বর্তমান মুহূর্ত থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় এক ভার্চুয়াল জগতে, যেখানে আমরা প্রায়শই আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করি।

ডিজিটাল ডিটক্স: নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম ধাপ

তাহলে এই আসক্তি থেকে মুক্তি মিলবে কীভাবে? প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ডিজিটাল ডিটক্স। এর মানে এই নয় যে আপনাকে রাতারাতি ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু কিছু নিয়ম মেনে চললে এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

ধাপে ধাপে মুক্তির পথ:

  • নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন: দিনের কোন কোন সময়ে আপনি ফোন ব্যবহার করবেন, তা আগে থেকে ঠিক করে নিন। যেমন, সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম এক ঘন্টা এবং রাতে ঘুমানোর আগের এক ঘন্টা ফোন থেকে দূরে থাকুন।
  • নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করুন: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। জরুরি নয় এমন নোটিফিকেশনগুলো আপনার মনোযোগ নষ্ট করবে।
  • ‘নো ফোন জোন’ তৈরি করুন: আপনার বাড়ি বা কর্মক্ষেত্রে কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করুন, যেখানে ফোন ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, ডাইনিং টেবিল বা বেডরুম।
  • শারীরিক কার্যকলাপে মনোযোগ দিন: প্রতিদিন কিছু সময় ব্যায়াম, হাঁটাচলা বা অন্য কোনো শারীরিক কাজের জন্য রাখুন। এতে মন ভালো থাকবে এবং ফোনের প্রতি আসক্তি কমবে।
  • বাস্তব জীবনের সম্পর্কে জোর দিন: বন্ধু এবং পরিবারের সাথে সরাসরি দেখা করুন, কথা বলুন। ভার্চুয়াল যোগাযোগের চেয়ে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক অনেক বেশি মূল্যবান।

‘স্ক্রিন টাইম’ কমানোর সহজ কৌশল

মোবাইলের স্ক্রিন টাইম কমানোর জন্য কিছু সহজ কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন:

  1. অ্যাপ লিমিট সেট করুন: অনেক স্মার্টফোনে এখন অ্যাপ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার সুবিধা আছে। এই ফিচারটি ব্যবহার করুন।
  2. গ্রে-স্কেল মোড ব্যবহার করুন: ফোনের ডিসপ্লেকে রঙিন থেকে সাদা-কালো করে ফেললে তা কম আকর্ষণীয় মনে হয় এবং ব্যবহারের প্রবণতা কমে আসে।
  3. গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন অ্যাপগুলো আনইনস্টল করুন: যে অ্যাপগুলো আপনার সময় নষ্ট করে বা আসক্তি বাড়ায়, সেগুলো ফোন থেকে সরিয়ে ফেলুন।
  4. বই পড়ুন বা শখের চর্চা করুন: হাতের কাছে একটি বই রাখুন, অথবা আপনার কোনো পুরনো শখ, যেমন ছবি আঁকা, গান শোনা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় সময় দিন।

‘রিঅ্যাল লাইফ’ রিচার্জ: নিজেকে সময় দিন

আমাদের ফোন যেমন চার্জ দিতে হয়, তেমনই আমাদের মন এবং শরীরকেও রিচার্জ করতে হয়। এই রিচার্জিংয়ের জন্য প্রয়োজন ‘রিঅ্যাল লাইফ’ অ্যাক্টিভিটি। প্রকৃতির সান্নিধ্য, প্রিয়জনের সাথে গল্প, বা নতুন কিছু শেখা – এগুলো আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যখন আমরা বাস্তব জীবনে মনোযোগ দেই, তখন ফোনের উপর নির্ভরতা কমে আসে।

আপনার মনে হতে পারে, ফোন ছাড়া জীবন অচল। কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই দেখবেন, ফোন আমাদের জীবনের একটি অংশ, পুরো জীবন নয়। যখন আপনি ফোনের বাইরে এসে নিজের এবং চারপাশের জগতকে নতুন করে দেখবেন, তখন বুঝবেন, জীবন কতটা রঙিন ও সুন্দর।

একটি ছোট্ট পরীক্ষা: আগামী ৭ দিন, প্রতিদিন অন্তত এক ঘন্টা ফোন বন্ধ রাখুন। এই সময়টুকু নিজের জন্য রাখুন। গান শুনুন, বই পড়ুন, বা শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকুন। দেখুন তো, আপনার কেমন লাগে!

“মোবাইল ফোন আমাদের জীবনে এনেছে অনেক সুবিধা, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে অনেক অমূল্য মুহূর্ত।”

স্মার্টফোন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, কিন্তু এর ব্যবহার যেন আমাদের দাস না বানিয়ে, বরং আমরাই এর চালক হই। নিজের সময়, নিজের মনোযোগ, নিজের জীবন – সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই। আজই শুরু হোক সেই মুক্তির যাত্রা!


মন্তব্য করুন