A human hand and a robotic hand extending fingers to touch, symbolizing connection.

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আপনার ভবিষ্যৎ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

তথ্য ও প্রযুক্তি






কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আপনার ভবিষ্যৎ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আপনার ভবিষ্যৎ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

কল্পনা করুন, আপনার স্মার্টফোন আপনাকে বলছে, “আজকের আবহাওয়াটা একটু অন্যরকম, তাই এই পোশাকটা পরাই ভালো।” অথবা আপনার গাড়ী নিজেই ঠিক করে নিচ্ছে কোন পথে গেলে জ্যাম এড়ানো যাবে, এমনকি আপনার প্রিয় কফি শপ থেকে আপনার জন্য অর্ডারও দিয়ে রেখেছে। এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক নতুন বাস্তবতা। কিন্তু এই ‘নতুন বাস্তবতা’ কি সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, নাকি আমরা অজান্তেই এমন এক শক্তির হাতে নিজেদের সঁপে দিচ্ছি, যা আমাদের জীবনযাত্রা, আমাদের পছন্দ-অপছন্দ—সবকিছুকে নীরবে প্রভাবিত করছে?

আপনার ঘুম ভাঙার আগেই যে অ্যালগরিদম জেগে ওঠে

আচ্ছা, বলুন তো, সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর প্রথম কোন জিনিসটা আপনার হাতে আসে? বেশিরভাগেরই উত্তর হবে স্মার্টফোন। আর সেই স্মার্টফোনটা আপনাকে কী দেখায়? খবরের অ্যাপগুলো হয়তো আপনাকে দিনের সবচেয়ে আলোচিত খবরগুলো তুলে ধরে, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করতে করতে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তার হিসেব থাকে না। কিন্তু এই সবকিছুর পেছনে কে আছে? আছে কিছু ‘অ্যালগরিদম’। এই অ্যালগরিদমগুলো আপনার আগের দিনের কার্যকলাপ, আপনার সার্চ হিস্টোরি, আপনি কীসে লাইক বা কমেন্ট করছেন—সবকিছু বিশ্লেষণ করে। এরপর তারা এমন সব কনটেন্ট আপনার সামনে হাজির করে, যা আপনার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। ভাবুন তো, এটা অনেকটা আপনার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর মতো, যে আপনার সব পছন্দ-অপছন্দ জানে এবং সেই অনুযায়ী আপনাকে নতুন নতুন জিনিস খুঁজে দেয়। কিন্তু পার্থক্যটা কোথায় জানেন? আপনার বন্ধু হয়তো আপনার ভালো চায়, কিন্তু এই অ্যালগরিদমগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আপনাকে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখা। যত বেশি সময় আপনি তাদের তৈরি করা জগতে থাকবেন, তাদের তত বেশি লাভ। তাই তারা ক্রমাগত চেষ্টা করে এমন কিছু আপনার সামনে আনতে, যা আপনাকে আরও বেশি আকৃষ্ট করবে। এটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী চাল—আপনার মনোযোগের উপর নিয়ন্ত্রণ।

যখন আপনার সিদ্ধান্তগুলোও ‘ব্যক্তিগতকরণ’ করা হয়

আপনি যখন অনলাইন শপিং করেন, তখন কি খেয়াল করেছেন যে আপনার পছন্দসই জিনিসগুলোই বেশি করে আপনার সামনে আসে? বা যখন কোনো সিনেমা দেখার জন্য প্ল্যাটফর্ম খোলেন, তখন আপনার ‘ব্যক্তিগত সুপারিশ’-এর তালিকাটা কেমন আপনার রুচির সঙ্গে মিলে যায়? এই সবই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজি। একে বলা হয় ‘পার্সোনালাইজেশন’ বা ব্যক্তিগতকরণ। এটি আপনার পছন্দ, আপনার ব্রাউজিং হিস্টরি, এমনকি আপনার কেনাকাটার ধরণ—সবকিছু বিশ্লেষণ করে আপনার জন্য একটি ‘ব্যক্তিগত প্রোফাইল’ তৈরি করে। এরপর সেই প্রোফাইলের ভিত্তিতে তারা আপনাকে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখায়, গানের রিকমেন্ডেশন দেয়, অথবা খবরের লিঙ্ক সাজেস্ট করে। আপাতদৃষ্টিতে এটা খুব সুবিধাজনক মনে হতে পারে। যেমন, আপনার প্রিয় ইউটিউব চ্যানেলের নতুন ভিডিও এলে আপনি সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশন পেয়ে যান। কিন্তু এর অন্য দিকটাও আছে। এই ব্যক্তিগতকরণের ফলে আমরা অনেক সময় একটি ‘ফিল্টার বাবল’-এর মধ্যে আটকে পড়ি। আমরা যা দেখতে চাই, যা শুনতে চাই, সেটাই আমাদের সামনে আসে। ভিন্ন মত বা নতুন কোনো ধারণা আমাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কমে যায়। ফলে, আমাদের চিন্তাভাবনাও একপেশে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, নাকি অ্যালগরিদম আমাদের জন্য সিদ্ধান্তগুলো তৈরি করে দিচ্ছে?

ফেসবুকের দেওয়ালে আর কি আপনার নিজস্বতা আছে?

সোশ্যাল মিডিয়ার কথাই ধরুন। আমরা সেখানে কী পোস্ট করব, কার সাথে বন্ধুত্ব করব, কী শেয়ার করব—এই সবকিছুর উপরই পরোক্ষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব রয়েছে। ধরুন, আপনি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের প্রতি আগ্রহী। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এটা ধরে ফেলবে এবং আপনাকে সেই সম্পর্কিত পোস্ট, সেই মতাদর্শের মানুষের প্রোফাইল বা সেই বিষয়ের খবরের দিকেই ঠেলে দেবে। ফলে, আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি নিজের পছন্দের মানুষদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, কিন্তু আসলে আপনি হয়তো একটি নির্দিষ্ট ‘ইকো চেম্বার’-এর অংশ হয়ে পড়ছেন। এই ইকো চেম্বারগুলোতে একই ধরণের মতামতের পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, যা আপনার ভাবনাকে আরও দৃঢ় করে এবং ভিন্ন মতকে গ্রহণ করার মানসিকতা কমিয়ে দেয়। প্রশ্ন হলো, যখন আপনার সামাজিক যোগাযোগও অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তখন কি আপনার স্বাধীনতা সত্যিই অক্ষুণ্ণ থাকছে?

ভবিষ্যতের ডাক্তার, শিক্ষক, এমনকি বিচারকও কি যন্ত্র?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু আমাদের বিনোদনের জগতেই সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্যসেবার দিকে তাকান। এখন অনেক জটিল রোগ নির্ণয়েও AI ব্যবহৃত হচ্ছে। এক্স-রে বা এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে AI অনেক সময় মানুষের চেয়েও নির্ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। আবার শিক্ষার জগতেও AI-এর ব্যবহার বাড়ছে। ব্যক্তিগতকৃত শেখার মডিউল তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা—এসব কাজে AI দারুণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এখানেই ভয়টা লুকিয়ে আছে। যদি আমাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো AI নিতে শুরু করে, যদি আমাদের সন্তানদের শিক্ষা AI-এর হাতে সঁপে দেওয়া হয়, তাহলে মানবীয় স্পর্শ কোথায় থাকবে? একজন ডাক্তার কেবল রোগ নির্ণয় করেন না, তিনি রোগীকে সাহস জোগান, রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝেন। একজন শিক্ষক শুধু সিলেবাস শেষ করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী বিকাশেও সাহায্য করেন। এই মানবিক দিকগুলো কি AI-এর পক্ষে বোঝা সম্ভব? যখন AI বিচারকের আসনে বসবে, তখন কি সে ন্যায়বিচার দিতে পারবে, নাকি কেবল ডেটা আর নিয়মের ভিত্তিতে রায় দেবে?

‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যা: আমরা যা বুঝি না, তা কি বিশ্বাস করব?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি বড় সমস্যা হলো এর ‘ব্ল্যাক বক্স’ প্রকৃতি। বিশেষ করে ডিপ লার্নিং মডেলগুলোর ক্ষেত্রে, তারা কীভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। তারা লক্ষ লক্ষ ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে আসে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ ব্যাখ্যা করা কঠিন। ভাবুন তো, যদি আপনার লোন অ্যাপ্লিকেশন AI বাতিল করে দেয়, অথবা আপনার চাকরির ইন্টারভিউ AI-এর দ্বারা নেওয়া হয় এবং আপনি কারণ না জেনেই বাদ পড়ে যান, তাহলে কী হবে? আপনি কোনো ব্যাখ্যা পাবেন না, কোনো আপিলের সুযোগও হয়তো থাকবে না। এই ‘অপ্রদর্শিত’ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সত্যিই উদ্বেগজনক। আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এমন কিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, যার কার্যকারিতা আমরা নিজেরাও বুঝি না?

আপনার অসচেতনতাই কি তাদের শক্তি?

আমরা অনেকেই হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্রভাব নিয়ে ভাবি না। ভাবি, এটা তো প্রযুক্তিরই অংশ, এতে ভয়ের কী আছে? বা ভাবি, আমার মতো সাধারণ মানুষের জীবনে এর কী-ই বা প্রভাব পড়বে? কিন্তু এখানেই আমাদের ভুলটা হয়। এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের অসচেতনতা এবং উদাসীনতার সুযোগ নেয়। আমরা যখন লাইক, শেয়ার, কমেন্ট করি, তখন আমরা অজান্তেই তাদের ডেটা ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করি। আমরা যখন তাদের দেওয়া সুপারিশগুলোকেই অন্ধভাবে মেনে নিই, তখন আমরা তাদের শক্তি আরও বাড়িয়ে দিই।

ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT): আপনার বাড়ি কি এখন গোয়েন্দা?

আপনার স্মার্ট স্পিকার, স্মার্ট ফ্রিজ, স্মার্ট লাইট—এগুলো সবই ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)-এর অংশ। এরা প্রতিনিয়ত ডেটা সংগ্রহ করছে। আপনার ঘরের কে কখন আসছে, আপনি কী বলছেন, কী খাচ্ছেন—সবকিছুর তথ্যই এই ডিভাইসগুলো সংগ্রহ করতে পারে। এই ডেটাগুলো কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এই ডেটাগুলো ব্যবহার করে বড় বড় কোম্পানিগুলো আমাদের সম্পর্কে এমন সব তথ্য জেনে যাচ্ছে, যা হয়তো আমরা নিজেরাও অন্যদের জানাতে চাই না। এই ডেটাগুলো কখনও বিজ্ঞাপনের জন্য, কখনও বা আরও সূক্ষ্মভাবে আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। আপনার নিজের বাড়িতেও আপনি আর একা নন, আপনার প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে উঠছে ডেটা-সংগ্রাহক যন্ত্র, যা পরিচালিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে।

শেষ কথা: যন্ত্রের দাস না হয়ে যন্ত্রের বন্ধু হওয়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে, অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু এর লাগাম যদি ভুল হাতে চলে যায়, অথবা যদি আমরা সচেতন না থাকি, তবে এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের শিকলও হয়ে উঠতে পারে। আমাদের প্রয়োজন সচেতন হওয়া। আমাদের বুঝতে হবে কোন অ্যালগরিদম আমাদের কী দেখাচ্ছে, কোন সুপারিশগুলো আমাদের প্রভাবিত করছে। আমাদের প্রয়োজন প্রশ্ন করা, অনুসন্ধান করা এবং নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করা। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুন, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হয়ে যাবেন না। আপনার নিজের জীবন, আপনার নিজের সিদ্ধান্ত—এগুলো একান্তই আপনার। যন্ত্রের তৈরি জগতে হারিয়ে না গিয়ে, যন্ত্রকে আপনার বন্ধু বানিয়ে, নিজের পথ নিজেই খুঁজে নিন। কারণ, আপনার ভবিষ্যৎ আপনারই হাতে—সেটা তৈরি করার দায়িত্ব আপনারই।


মন্তব্য করুন