Stunning view of the ancient Pyramid of Chichén Itzá with a bright blue sky and clouds.

বিশ্ব জয়! এবারও গিনেসের পাতায় বাঙালি

বিশ্ব রেকর্ড






প্রথম আলো ফিচার


বিশ্ব জয়! এবারও গিনেসের পাতায় বাঙালি

ভাবুন তো, কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে, শত শত মাইল পেরিয়ে, আপনার নাম লেখা হলো এক বিশ্বসেরা তালিকায়! শুধু একবার নয়, বারবার! এ শুধু স্বপ্ন নয়, এ আমাদেরই এক চেনা মুখ, এক চেনা দেশের মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়গান।

যখন ছোট্ট গ্লাসগুলোই হয়ে ওঠে বিশ্বরেকর্ডের ধারক

গত সপ্তাহে যখন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট খুলে দেখলাম, তখন মনে হলো, “আরে, এ তো আমাদের পরিচিত মুখ!” হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আবার এক বাঙালি, হ্যাঁ, আমাদেরই এক ভাই, নিজের নামে এক নতুন বিশ্বরেকর্ড লিখিয়ে নিয়েছেন। এবার যে রেকর্ড, তা সাধারণ নয়। ভাবুন তো, একটি বিশেষ দিনে, একটি বিশেষ সময়ে, একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গ্লাসের উপর থেকে পাইপ দিয়ে বাতাস ফুঁ দিয়ে সেগুলোকে এক লাইনে সাজাতে পারেন! শুনতে হয়তো একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু এখানেই তো গিনেসের মজা। তারা যে কোনো সাধারণ বা অসাধারণ কাজকেই তাদের পাতায় জায়গা করে দেয়, যদি সেটা হয় বিশ্বসেরা।

এই বাঙালি, যার নাম আমরা পরে জানব, তিনি প্রায় ৫০০ টিরও বেশি গ্লাস এই পদ্ধতিতে সাজাতে সক্ষম হয়েছেন। এই সংখ্যাটা ভাবুন! আপনার নিজের বাড়িতে কি এতগুলো গ্লাস আছে? বা থাকলেও, সেগুলোকে এভাবে সাজানোর কথা কি কখনো ভেবেছেন? এই সাধারণ জিনিসগুলোকে ব্যবহার করে যে এমন অসাধারণ কীর্তি গড়া যায়, তা আমাদের অনেকেই হয়তো কল্পনাও করতে পারি না।

শুধু গ্লাস নয়, বাঙালি মানেই রেকর্ডের নানা পসরা

আপনি যদি ভাবেন, বাঙালির গিনেসের পাতায় নাম লেখানোর এই প্রথমবার, তাহলে ভুল ভাবছেন। এর আগেও আমরা দেখেছি, কত নানাভাবে বাঙালিরা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন। মনে পড়ে, সবচেয়ে বড় আলপনা আঁকার রেকর্ড? কিংবা এক মিনিটে সবচেয়ে বেশিবার হাততালি দেওয়ার বিশ্বরেকর্ড? অথবা সবচেয়ে বড় ফুচকার স্তূপ? এই সবই কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের কীর্তি!

আসলে, এই রেকর্ডগুলো শুধু সংখ্যা বা পরিমাণের হিসেব নয়। এর পিছনে রয়েছে অদম্য জেদ, কঠোর পরিশ্রম আর নিজেদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। ধরুন, আপনি যদি কোনোদিন ঠিক করেন যে, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বই নিয়ে একটি পিরামিড বানাবেন, তাহলে প্রথমে আপনাকে ভাবতে হবে কতগুলো বই লাগবে, সেগুলো কিভাবে সাজাবেন, কোথায় সাজাবেন, এবং সবচেয়ে বড় কথা, কতটা সময় ও শক্তি ব্যয় করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটাই কিন্তু একটা ছোটখাটো অভ্যাসের মতো। আপনি যখন কোনো কিছুতে মন দেন, তখন ধীরে ধীরে সেটা আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়। আর গিনেসের রেকর্ডধারীরা সেই অভ্যাসটাকেই চরম পর্যায়ে নিয়ে যান।

এই যে গ্লাসের উপর পাইপ দিয়ে বাতাস ফুঁ দিয়ে সাজানোর ব্যাপারটা, এটা শুনতে সহজ লাগলেও এর মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় লুকিয়ে আছে। যেমন, পাইপের মুখটা গ্লাসের ঠিক কোথায় ধরলে সবচেয়ে ভালোভাবে বাতাস লাগবে, বাতাসের জোর কতটা হলে গ্লাসটা নড়বে অথচ পড়ে যাবে না, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটার পর একটা গ্লাস সাজানোর সময় আগের গ্লাসগুলোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এটা অনেকটা জ্যাকলিং (Jenga) খেলার মতো, যেখানে একটাও কাঠি ভুলভাবে টানলে পুরো টাওয়ারটাই ধসে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের এই বাঙালি সহোদর, অত্যন্ত ধৈর্য ও দক্ষতার সাথে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

ছোটবেলার স্বপ্নগুলোও যে হয়ে ওঠে সত্যি

অনেকেই বলেন, “আমার ছোটবেলায় অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেগুলো পূরণ হয়নি।” কিন্তু এই রেকর্ডগুলো যারা গড়েন, তাদের অনেকেরই স্বপ্ন কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই শুরু। হয়তো তারা ছোটবেলায় সবচেয়ে লম্বা কাঠি দিয়ে কিছু বানানোর চেষ্টা করতেন, অথবা খেলার সময় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বল এক হাতে ধরার চেষ্টা করতেন। এই রেকর্ডধারীও হয়তো ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে খেলতেন, আর ভাবতেন, “আচ্ছা, আমি কি এই বলগুলোকে এভাবে ধরে রাখতে পারি?” বা “আমি কি এই কয়েনগুলোকে এভাবে সাজাতে পারি?”

এই যে সাধারণ কৌতূহল, এই যে জানার আগ্রহ, এটাই কিন্তু নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা যোগায়। ভাবুন তো, ছোটবেলায় আমরা অনেকেই মার্বেল দিয়ে কত ধরনের খেলা খেলতাম। কেউ হয়তো সবচেয়ে বেশি মার্বেল একসাথে ছুঁড়ে মারতে পারত, কেউ আবার নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে সবচেয়ে বেশি মার্বেলকে হিট করতে পারত। এই একই ধরনের দক্ষতা, একই ধরনের কৌতূহল, যখন সঠিক পথে চালিত হয়, তখন তা গিনেসের মতো বিশ্বসেরা মঞ্চে পৌঁছে যায়।

শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের জন্যও

যখন কোনো বাঙালি গিনেসের পাতায় নাম লেখান, তখন শুধু তার নিজের পরিবার বা বন্ধুবান্ধবই খুশি হন না, খুশি হয় পুরো দেশ। এটা যেন আমাদের সবার জন্য এক একটা ছোট্ট বিজয়। এটা প্রমাণ করে যে, সীমিত সুযোগ-সুবিধাতেও বাঙালিরা অসম্ভবকে জয় করতে পারে। আমাদের দেশে অনেক প্রতিভাবান মানুষ আছেন, যাদের হয়তো সঠিক প্ল্যাটফর্ম বা প্রশিক্ষণের অভাব। কিন্তু এই রেকর্ডগুলো তাদেরও মনে আশা জাগায়। তারা ভাবেন, “যদি ও পারে, তবে আমিও পারব।”

এই যে গ্লাস সাজানোর রেকর্ড, এর মাধ্যমে হয়তো কেউ ভাবছেন, “আচ্ছা, আমি কি আরও বেশি সংখ্যক গ্লাস দিয়ে কিছু করতে পারি?” অথবা “আমি কি অন্য কোনো সাধারণ জিনিস দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়তে পারি?” এই প্রশ্নগুলোই কিন্তু নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। হতে পারে, আপনার পাশের বাড়ির ছেলেটি একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাগজের প্লেন বানানোর রেকর্ড করবে, অথবা আপনার স্কুলের দিদিমণি সবচেয়ে দ্রুত হাতে কাঁচি দিয়ে কাপড় কাটবেন। কে জানে!

কীভাবে এই রেকর্ডটি তৈরি হলো?

আমরা জেনেছি, এই রেকর্ডধারী ব্যক্তি, যার নাম মোঃ রফিকুল ইসলাম, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড নিয়ে পড়াশোনা করতেন এবং ভাবতেন, তিনি নিজেও এমন কিছু করতে পারেন কিনা। অবশেষে, তিনি এই বিশেষ ধরনের রেকর্ডটি বেছে নেন।

রেকর্ডটি ভাঙার জন্য তিনি কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রথমে তিনি সাধারণ কাঁচের গ্লাস দিয়ে অনুশীলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি বিভিন্ন আকারের গ্লাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, গ্লাসের ওজন, পৃষ্ঠের মসৃণতা এবং বাতাসের চাপ—এগুলো সবই রেকর্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একটি বিশেষ ধরনের পাইপ ব্যবহার করেন, যা দিয়ে তিনি নিখুঁতভাবে বাতাস ফুঁ দিতে পারতেন।

রেকর্ডের দিন, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শক ও গিনেসের একজন বিচারকের উপস্থিতিতে, তিনি এই অবিশ্বাস্য কাজটি সম্পন্ন করেন। তিনি প্রায় ৫০০ টির বেশি গ্লাস সফলভাবে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজিয়ে ফেলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে তার সময় লেগেছিল মাত্র ১০ মিনিট। এই পুরো সময়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী এবং নির্ভুল।

পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তিই সাফল্যের চাবিকাঠি

মোঃ রফিকুল ইসলামের এই সাফল্য আমাদের সবাইকে এক নতুন বার্তা দেয়। এটি শেখায় যে, কোনো স্বপ্নই ছোট নয়, যদি তা পূরণের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করা যায়। এটা শুধু গ্লাস সাজানোর রেকর্ড নয়, এটা আমাদের সবার মনের ভেতরের সেই অদম্য ইচ্ছার প্রতিফলন, যা আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করতে উৎসাহিত করে।

তাই, আপনার মনে যদি কোনো বিশেষ কিছু করার ইচ্ছা থাকে, তা যতই সাধারণ বা অস্বাভাবিক মনে হোক না কেন, চেষ্টা করে দেখুন। কে বলতে পারে, আগামী দিনে হয়তো আপনার নামও লেখা হবে গিনেসের পাতায়! স্বপ্ন দেখুন, সাহস রাখুন, আর এগিয়ে যান


মন্তব্য করুন