Close-up of a hand holding multiple Bangladesh flags during Victory Day celebrations.

অলিম্পিকে বাংলাদেশের স্বপ্ন, নতুন দিগন্তের হাতছানি!

খেলাধুলা






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – অলিম্পিকে বাংলাদেশের স্বপ্ন, নতুন দিগন্তের হাতছানি!


অলিম্পিকে বাংলাদেশের স্বপ্ন, নতুন দিগন্তের হাতছানি!

আচ্ছা, ভাবুন তো, আপনার ছেলেমেয়ে, বন্ধু বা পরিচিত কেউ একদিন অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে লড়ছে, আর আপনি টিভির পর্দায় সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেখছেন – কেমন লাগবে সেই অনুভূতি? সেই রোমাঞ্চ, সেই গর্ব, সেই স্বপ্নভঙ্গ বা স্বপ্নপূরণের টানাপোড়েন… আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, যখন প্রথম আধুনিক অলিম্পিক শুরু হয়েছিল, তখন হয়তো এমন স্বপ্ন দেখাটাও ছিল বিলাসিতা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, অনেক দেশই এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশও কি পারবে সেই সোনালী অধ্যায়ের অংশ হতে? আজকের তারিখ 20 August 2026, আর এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা কি কেবলই দর্শক হয়ে থাকব, নাকি তারাও একদিন নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশকে পরিচিত করাবে?

শুধু পদক নয়, অলিম্পিকের মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতি কি এক অন্যরকম অর্জন?

অনেকেই হয়তো বলবেন, ‘কী দরকার এসব ভেবে? আমাদের তো তেমন পরিকাঠামো নেই, খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াও সেভাবে গড়ে ওঠেনি।’ কিন্তু সত্যি বলতে, অনেক দেশই কিন্তু এই প্রতিকূলতাকে জয় করে অলিম্পিকে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। ভাবুন তো, জামাইকা! একটা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, যাদের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু বিশ্ববাসী তাদের চেনে স্প্রিন্টারদের দেশ হিসেবে। উসাইন বোল্টের মতো কিংবদন্তি জন্ম দিয়েছে তারা। অথবা ফিজি! রাগবিতে তাদের স্বর্ণপদক জয়ের গল্পও কম রোমাঞ্চকর নয়। তাদের কি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ছিল? হয়তো না। কিন্তু ছিল অদম্য ইচ্ছা, ছিল সঠিক পরিকল্পনা, ছিল দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।

অলিম্পিক মানেই শুধু পদক জেতা নয়। অলিম্পিক মানে হলো বিশ্ব দরবারে নিজের দেশের পরিচয় তুলে ধরা। অলিম্পিক মানে হলো লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা। একবার ভাবুন, যদি বাংলাদেশের কোনো সাঁতারু, জিমন্যাস্ট বা তীরন্দাজ অলিম্পিকের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়, তাহলে কি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের চিত্রটা বদলে যাবে না? হাজার হাজার শিশু-কিশোর তখন হয়তো সেই স্বপ্ন দেখবে, সেই পথে হাঁটতে চাইবে। এটাই অলিম্পিকের আসল জাদু। এটা শুধু খেলা নয়, এটা একটা আন্দোলন।

‘বাংলার বাঘ’ থেকে ‘বাংলার অ্যাথলিট’: সম্ভাবনা কোথায় লুকিয়ে?

আমরা ক্রিকেট নিয়ে গর্ব করি, ‘বাংলার বাঘ’ বলে সাকিবের মতো অলরাউন্ডারদের বিশ্বজুড়ে পরিচিতি। কিন্তু অলিম্পিকের জন্য তো শুধু ক্রিকেট নয়, আরও কত খেলা! আমাদের নদীমাতৃক দেশে সাঁতার কাটার মতো সাধারণ একটা দক্ষতার কতখানি বিকাশ আমরা ঘটাতে পেরেছি? গ্রামবাংলার মেঠো পথে দৌড়ানো ছেলেগুলোর মধ্যে কি লুকিয়ে নেই ভবিষ্যতের স্প্রিন্টার? অথবা আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী কুস্তি বা জিমন্যাস্টিকসের মতো খেলাগুলোয় প্রতিভার অভাব আছে কি?

সমস্যাটা আসলে সুযোগের। আমাদের অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় হয়তো সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে, উন্নত মানের সরঞ্জামের অভাবে, অথবা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার সুযোগ না পেয়ে হারিয়ে যায়। ধরুন, একজন ছেলে খুব ভালো দৌড়ায়, কিন্তু তার জন্য ভালো ট্র্যাক নেই, ভালো কোচ নেই, ভালো জুতো নেই। তাহলে সে কীভাবে অলিম্পিকের স্বপ্ন দেখবে? এটা অনেকটা এমন যে, আপনি একটা সুন্দর বীজ পেয়েছেন, কিন্তু তাকে মাটি, জল, আলো কোনোটাই দিচ্ছেন না। তাহলে সেই বীজ থেকে কি বড় গাছ হবে?

তবে আশার আলো কিন্তু একেবারে নিভে যায়নি। ইদানিংকালে কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। যেমন, কিছু স্কুল বা একাডেমী জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার বা অ্যাথলেটিক্সে ভালো করছে। সরকারও হয়তো ধীরে ধীরে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে। কিন্তু অলিম্পিকের মতো বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যে দীর্ঘমেয়াদী, সুসংহত পরিকল্পনা দরকার, সেটা এখনও হয়তো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আমাদের প্রয়োজন এমন একটা পরিকাঠামো, যেখানে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদরা তাদের সেরাটা দেওয়ার সুযোগ পাবে, যেখানে তাদের স্বপ্নকে যত্নের সাথে লালন করা হবে, ঠিক যেমন আমরা আমাদের সন্তানদের বড় করি।

অলিম্পিকের ‘স্বপ্নের কারিগর’: কারা হতে পারে সেই বিপ্লবীরা?

অলিম্পিকের স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন শুধু খেলোয়াড় নয়, প্রয়োজন একদল নিবেদিতপ্রাণ কোচ, প্রশিক্ষক, ক্রীড়া সংগঠক এবং অবশ্যই, সরকারের ধারাবাহিক সমর্থন। কোচিংয়ের আধুনিক পদ্ধতি, খেলার বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ, খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্য – এই সবকিছুর উপর জোর দিতে হবে। আমাদের দেশেই এমন অনেক কোচ আছেন যাদের হয়তো আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নেই, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা আর শেখানোর আগ্রহ অসীম। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, তাদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া – এগুলো খুব জরুরি।

ভাবুন তো, যদি আমাদের দেশে এমন কিছু ‘স্পোর্টস অ্যাকাডেমি’ গড়ে ওঠে, যেখানে বাছাই করা তরুণ-তরুণীরা সম্পূর্ণ সরকারি খরচে, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, আবাসন এবং পুষ্টিকর খাবার পাবে? ঠিক যেমনটা অনেক উন্নত দেশে হয়। তাহলে হয়তো আমাদের দেশ থেকে উঠে আসবে অলিম্পিকে পদক জেতার মতো খেলোয়াড়। এটা রাতারাতি হবে না, এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ। অনেকটা গাছের চারা রোপণের মতো। আজ রোপণ করলে, কালকেই ফল দেবে না। তাকে যত্ন করে বড় করতে হবে, নিয়মিত জল দিতে হবে, সার দিতে হবে, তবেই না সে একদিন মহীরুহ হবে।

আমাদের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর উচিত একযোগে কাজ করা। শুধু দল গঠন করে পাঠিয়ে দেওয়া নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতির উপর জোর দেওয়া। আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া, তাদের পারফরম্যান্স ট্র্যাক করা এবং দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।

ছোট ছোট পদধ্বনি, বড় স্বপ্নের দিকে: কে হবে আমাদের প্রথম অলিম্পিক তারকা?

আজ 20 August 2026। হয়তো প্যারিস অলিম্পিক (2024) বা লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক (2028) আমরা দর্শক হিসেবেই দেখেছি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আমাদের স্বপ্ন শেষ। বরং, এই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের আরও শেখার আছে। কোন কোন খেলায় আমাদের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় আমরা পিছিয়ে আছি, কীভাবে সেই ব্যবধান কমানো যায় – এইসব নিয়ে গভীর পর্যালোচনা দরকার।

আমাদের ছোট ছোট সাফল্যগুলোকেও বড় করে দেখতে হবে। হয়তো এখনই আমরা অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ের কথা ভাবছি না, কিন্তু কোনো খেলায় যদি আমাদের খেলোয়াড় মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, সেটাই হবে এক বিরাট প্রাপ্তি। যেমন, মাবিয়া আক্তার বা জিয়ার মতো ভারোত্তোলকরা যখন কমনওয়েলথ গেমসে পদক জিতেছেন, সেটা কি আমাদের অনুপ্রাণিত করেনি? হয়তো তারা অলিম্পিক পদকের কাছাকাছি যাননি, কিন্তু তারা যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন, সেটাই বড় কথা।

আজ যারা মাঠে খেলছে, যারা একাডেমীতে অনুশীলন করছে, হয়তো তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিক তারকা। তাদের শুধু খুঁজে বের করতে হবে, তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রচার এবং উৎসাহ। যখন একজন সাধারণ মানুষও অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা দেখবে, তখন সে শুধু একজন খেলোয়াড়কেই দেখবে না, দেখবে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্নপূরণের প্রতিচ্ছবি।

আমরা কি পারব সেই দিনটা দেখতে? যেদিন বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড় অলিম্পিক পদক জিতে জাতীয় সংগীতের সাথে বাংলাদেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরবে? সেই স্বপ্ন দেখাটা কি খুব বেশি? হয়তো না। কারণ, স্বপ্ন দেখলেই তো তাকে সত্যি করার পথে এগোনো যায়। আর এই স্বপ্ন পূরণের জন্য দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বিশ্বাস এবং অদম্য সাহস। এই যাত্রাটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক, এই প্রার্থনাই করি!


মন্তব্য করুন