A striking 3D render of a green alien planet with a dark background, evoking science fiction themes.

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্ত উন্মোচন

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্ত উন্মোচন


মহাকাশে প্রাণের সন্ধান: নতুন দিগন্ত উন্মোচন

আচ্ছা, ভাবুন তো, রাতের আকাশে আমরা যে অগণিত তারা দেখি, তার মধ্যে কোনো একটিতে কি প্রাণের স্পন্দন নেই? আমরা যে একা নই, এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে, এমনটা ভাবার কারণ কি কেবলই আমাদের কল্পনা? আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে, যখন মানুষ প্রথম চাঁদে পা রেখেছিল, তখন হয়তো এই প্রশ্নটা অনেকের মনেই উঁকি দিয়েছিল। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞান কেবল কল্পনাতেই আটকে নেই। আমাদের হাতে রয়েছে এমন সব প্রযুক্তি আর জ্ঞান, যা এই চিরন্তন প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার পথে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।

ভিনগ্রহের মাটি কি কখনো আমাদের হাত ছুঁয়েছে?

আমরা যখন আমাদের গ্রহের বাইরে অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্বের কথা বলি, তখন প্রথমেই আমাদের মনে আসে মঙ্গল গ্রহের কথা। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন রোভার আর অরবিটার মঙ্গলের পৃষ্ঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাটি খুঁড়ছে, ছবি তুলছে। আর সম্প্রতি, ‘পারসিভারেন্স’ রোভারের পাঠানো কিছু ডেটা আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। মঙ্গলের কিছু শিলাস্তরে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা পৃথিবীতে প্রাণের উপস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, ধরুন আপনি আপনার রান্নাঘরে একটি কেকের টুকরো খুঁজে পেলেন, যার গন্ধ, টেক্সচার সবকিছুই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি আপনার প্রিয় মিষ্টির দোকানেই তৈরি হয়েছে। মঙ্গলের এই ‘কেকের টুকরো’গুলো হয়তো কোনো একদিন আমাদের বলবে যে সেখানে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, বা হয়তো এখনো আছে!

কিন্তু শুধু মঙ্গল নয়, আমাদের সৌরজগতের বাইরেও প্রাণের সন্ধান চলছে পুরোদমে। বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের ছায়াপথের মধ্যেই এমন অনেক গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলোকে বলা হচ্ছে ‘এক্সোপ্ল্যানেট’। এর মধ্যে কিছু গ্রহ পৃথিবীর মতোই পাথুরে এবং তাদের তারা থেকে ঠিক ততটা দূরে অবস্থিত, যেখানে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে। ভাবুন তো, আমাদের পৃথিবী যেমন সূর্যের চারপাশে ঘুরছে, তেমনই লক্ষ লক্ষ দূরবর্তী কোনো তারা, যার নাম হয়তো আমরা এখনো জানিই না, তার চারপাশে ঘুরছে এমন একটি গ্রহ, যেখানে মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হচ্ছে, আর হয়তো নদীর স্রোত বয়ে চলেছে! এ যেন এক অচেনা পৃথিবীর হাতছানি।

বৃহস্পতির বরফ-ঢাকা চাঁদ কি লুকিয়ে রেখেছে জীবনের রহস্য?

মঙ্গল গ্রহের বাইরেও কিন্তু আমাদের সৌরজগতেই লুকিয়ে আছে প্রাণের বড় সম্ভাবনা। বৃহস্পতির চাঁদ ‘ইউরোপা’ বা শনির চাঁদ ‘এনসেলাডাস’-এর কথা ভাবুন। এদের পৃষ্ঠে বরফের পুরু আস্তরণ, কিন্তু বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, এই বরফের নিচে লুকিয়ে আছে বিশাল বিশাল সমুদ্র। ভাবুন তো, পৃথিবীর সমুদ্রের মতোই যেখানে লবণাক্ত জল, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, কিন্তু ভূ-তাপীয় শক্তি বা ‘হাইড্রothermal vents’ থেকে তাপ আর রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায়— ঠিক যেমনটা পৃথিবীর গভীর সমুদ্রেও দেখা যায়। আর সেই গভীর সমুদ্রেই কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তাহলে এনসেলাডাস বা ইউরোপার সেই বরফ-ঢাকা সমুদ্রের নিচে কি আমাদের মতো জীবনের কোনো আদিম রূপ লুকিয়ে নেই? এই প্রশ্নটা আজ বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে!

এই চাঁদগুলোতে প্রাণের সন্ধান পেতে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন মিশন পরিকল্পনা করছেন। ‘ইউরোপা ক্লিপার’-এর মতো মহাকাশযানগুলো ইউরোপার বরফের আস্তরণ ভেদ করে ভেতরের সমুদ্রের তথ্য নিয়ে আসবে। হয়তো একদিন আমরা এমন ছবি দেখব, যেখানে বরফের ফাটল দিয়ে জলীয় বাষ্প বেরিয়ে আসছে, আর সেই বাষ্প পরীক্ষা করে আমরা জানতে পারব সেখানে কোনো জৈবিক অণু বা ‘বায়োসিগনেচার’ আছে কিনা। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, ধরুন আপনি একটি বদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে আসা কোনো সুর শুনে বোঝার চেষ্টা করছেন যে ভেতরে কে গান গাইছে।

আমরা কি একা? মহাকাশ গবেষণার নতুন মোড়

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের মূল প্রশ্নগুলোর একটি। আমরা কে? কোথা থেকে এসেছি? আমরা কি সত্যিই একা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা মহাকাশ গবেষণায় নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছি। ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’-এর মতো শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের অনেক গভীরে উঁকি মারতে সাহায্য করছে। এটি এতটাই শক্তিশালী যে, প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর আগের মহাবিশ্বের ছবিও তুলতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা এমন সব এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করতে পারছি, যা আগে সম্ভব ছিল না।

ভাবুন তো, আমরা যখন একটি দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করি, তখন আমরা সেখানে অক্সিজেন, মিথেন বা কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাসের উপস্থিতি খুঁজি। যদি এই গ্যাসগুলোর কোনো বিশেষ সংমিশ্রণ পাওয়া যায়, যা পৃথিবীতে কেবল জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তৈরি হয়, তবে সেটা হবে প্রাণের এক শক্তিশালী ইঙ্গিত। এটা অনেকটা একজন গোয়েন্দার মতো, যিনি একটি অপরাধের ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু সূত্র খুঁজে বের করেন, যা অপরাধীকে ধরতে সাহায্য করে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আজ মহাকাশে তেমনই সব ‘সূত্র’ খুঁজছে।

SETI-এর পুরনো প্রশ্ন, নতুন উত্তর

SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) সংস্থাটি বহু বছর ধরে মহাকাশে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণের সংকেত খুঁজছে। তারা রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাকাশ থেকে আসা সিগন্যালগুলো শোনার চেষ্টা করে। এতদিন যা কিছুটা কল্পবিজ্ঞান মনে হতো, আজ তা আরও বেশি বাস্তব হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে SETI এখন আরও উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করছে এবং আরও বেশি ডেটা বিশ্লেষণ করছে।

এমনও হতে পারে, যে ভিনগ্রহের কোনো সভ্যতা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে এবং তারা আমাদের দিকে সংকেত পাঠাচ্ছে। আমরা হয়তো তাদের সংকেত এখনো ধরতে পারিনি, অথবা তাদের ভাষা বুঝতে পারিনি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, ধরুন আপনি একটি জনবহুল শহরে বাস করছেন, কিন্তু আপনার বাড়িটি এমন এক গলিতে, যেখানে কেউ সহজে আসে না। আপনার আশেপাশে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ আছে, কিন্তু তাদের সাথে আপনার পরিচয় নেই। মহাকাশেও হয়তো এমন অনেক সভ্যতা আছে, যারা নিজেদের মতো করে বেঁচে আছে, কিন্তু তাদের সাথে আমাদের সংযোগ এখনো স্থাপিত হয়নি। SETI সেই সংযোগ স্থাপনেরই চেষ্টা করছে।

জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান কি সত্যিই বিরল?

আমাদের পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য কিছু মৌলিক উপাদানের প্রয়োজন হয়েছে— জল, কার্বন, এবং সঠিক তাপমাত্রা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই উপাদানগুলো হয়তো মহাবিশ্বে ততটা বিরল নয় যতটা আমরা ভাবতাম। অনেক গ্রহেই জলের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, কার্বনও মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। সুতরাং, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘উপকরণ’ যদি সহজলভ্য হয়, তবে প্রাণের বিকাশ ঘটার সম্ভাবনাও কিন্তু অনেক বেড়ে যায়।

আমাদের শরীর মূলত জল আর কার্বনের এক জটিল মিশ্রণ। আমাদের রক্তে যে লবণাক্ততা, তা পৃথিবীর আদিম সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই একই ধরনের রাসায়নিক পরিবেশ অন্য গ্রহেও থাকতে পারে। ভাবুন তো, আপনি যদি একটি বিরাট রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখেন, সেখানে সব ধরনের খাবার তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণই মজুত আছে, তাহলে কি সেখানে নানা রকম রান্না হওয়ার সম্ভাবনা নেই? মহাবিশ্বও তেমনই এক বিশাল রেস্টুরেন্ট, যেখানে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণই রয়েছে!

ভবিষ্যৎ কী বলছে?

আগামী দশকগুলোতে মহাকাশে প্রাণের সন্ধান আরও তীব্র হবে। আমরা আরও উন্নত টেলিস্কোপ পাব, নতুন নতুন মহাকাশযান পাঠাবো। হয়তো আমরা এমন দিন দেখব, যখন আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে আমরা একা নই। হতে পারে, সেই প্রাণের রূপ আমাদের পরিচিত নয়— ব্যাকটেরিয়ার মতো সরল জীবন, অথবা সম্পূর্ণ অচেনা কোনো রূপ।

মহাকাশে প্রাণের সন্ধান আমাদের শেখায় যে, আমাদের এই ছোট্ট নীল গ্রহটি কতটা মূল্যবান এবং আমরা কতটা সৌভাগ্যবান। এটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের প্রশ্নগুলো যেন কখনো শেষ না হয়, আমাদের জানার আগ্রহ যেন সবসময় অমলিন থাকে। কারণ, এই মহাবিশ্ব এক অপার রহস্যের ভান্ডার, আর সেই রহস্যের জাল ভেদ করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ।


মন্তব্য করুন