Close-up of vintage piano keys and music sheet with warm, moody lighting.

হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে এক অসম্ভবের যাত্রা

গল্পের আসর






হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে এক অসম্ভবের যাত্রা


হারিয়ে যাওয়া সুরের খোঁজে এক অসম্ভবের যাত্রা

আপনি কি জানেন, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এক টুকরো বাঁশি, যা প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে গুহায় তৈরি হয়েছিল? ভাবুন তো, সেই সুরগুলো আজ কোথায়? সময়ের স্রোতে কত গান, কত সুর হারিয়ে গেছে, যা হয়তো আমাদের কল্পনারও অতীত!

যে সুরেরা নীরবে বিদায় নেয়

আমাদের চারপাশে কত কিছুই না হারিয়ে যায় রোজ। প্রিয়জনের মুখ, ফেলে আসা শৈশব, এমনকি বহু চেনা রাস্তাঘাটও অচেনা হয়ে যায় সময়ের নিয়মে। কিন্তু কিছু জিনিস আছে, যা হারিয়ে গেলে কেবল স্মৃতিতেই নয়, আমাদের আত্মিক অস্তিত্বেও এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। এমন এক হারিয়ে যাওয়া সুরের কথা আজ বলব, যা কেবল একটি গান নয়, ছিল এক জনগোষ্ঠীর শেকড়, তাদের জীবনধারা, তাদের ইতিহাস। “এক অসম্ভবের যাত্রা” – এই কথাটি শুনতে হয়তো খানিকটা নাটকীয় লাগছে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অদম্য জেদ এবং ভালোবাসার গল্প।

ধরুন, আপনি এমন এক সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন যেখানে প্রত্যেক রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটি বিশেষ গান গাওয়া হতো। সেই গানটি ছিল আপনাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া। সেই গানে মিশে থাকত প্রকৃতির গান, পাহাড়ের ডাক, নদীর কলতান, আর আপনাদের নিজেদের জীবনের গল্প। কিন্তু একদিন, কোনো এক অজানা কারণে, সেই গানটি আর কেউ গায় না। ধীরে ধীরে, সময়ের পরিক্রমায়, সেই সুর কেবল কিছু প্রবীণের মনে ক্ষীণ স্মৃতি হয়ে থাকে। নতুন প্রজন্ম সেই সুর শোনেই না, জানেও না। ঠিক এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন ডঃ অনন্যা সেন, একজন নৃতত্ত্ববিদ ও লোকসংগীত গবেষক।

কোথায় সেই সুরের প্রতিধ্বনি?

ডঃ সেনের গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লুপ্তপ্রায় লোকসংগীত। এই জনগোষ্ঠীটি প্রায় দেড়শ বছর আগে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তাদের মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রার অনেক কিছুই সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ডঃ সেনের মনে হয়েছিল, তাদের লোকসংগীতের গভীরে এমন কিছু ছিল যা তাদের পরিচয়কে ধরে রেখেছিল। তিনি শুনেছিলেন, তাদের পূর্বপুরুষেরা নাকি এমন কিছু গান গাইতেন যা “পাহাড়ের কথা বলে, নদীর গান শোনায়”। কিন্তু সেই গানগুলো আজ কেবলই কিংবদন্তী।

অনেকেই ডঃ সেনকে বলেছেন, “এসব করে কী লাভ? যা হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না। সময়কে মেনে নিন।” কিন্তু অনন্যার কাছে এই সুরগুলো কেবল কিছু নোট বা তাল ছিল না। এগুলো ছিল ওই জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ইতিহাস, তাদের আনন্দ, বেদনা, তাদের জীবনের দর্শন। তিনি এটিকে দেখেছিলেন একটি জীবন্ত ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা হিসেবে।

প্রথম ধাপ: ধোঁয়াশা ভেদ করা

অনন্যার যাত্রা শুরু হয়েছিল একরাশ ধোঁয়াশা আর অস্পষ্ট স্মৃতি নিয়ে। তিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তিদের। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের খণ্ড খণ্ড অংশ জুড়ে তিনি একটি ছবি তৈরি করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

  • স্মৃতিচারণ: তিনি শুনলেন কিছু পুরানো দিনের মানুষের কাছে কিছু গানের কথা, কিছু সুরের আভাস। কেউ হয়তো গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন দু’একটি লাইন, যা আর সম্পূর্ণ নয়।
  • ঐতিহাসিক দলিল: তিনি পুরনো কিছু পুঁথি, লোককথা, এমনকি কিছু ব্রিটিশ আমলের নৃতাত্ত্বিকদের লেখা ঘেঁটে দেখলেন। সেখানেও মিলল কিছু সূত্র, যা তাঁর গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেল।
  • সাংস্কৃতিক যোগসূত্র: তিনি সেই জনগোষ্ঠীর প্রতিবেশী অন্যান্য জনগোষ্ঠীর গানের সুর, তাদের রীতিনীতি, উৎসবের সঙ্গে তুলনা করে কিছু ধারণা তৈরি করলেন।

এই সব তথ্যের মধ্যে, একটি বিশেষ সুরের কথা বারবার উঠে আসছিল। বলা হচ্ছিল, এটি ছিল “প্রকৃতির সুর”, যা তারা গাইতেন যখন প্রকৃতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসত – যেমন বন্যা, খরা বা নতুন ফসল বোনার সময়। এই সুরের মধ্যে নাকি এক বিশেষ কম্পন ছিল, যা প্রকৃতিকেও প্রভাবিত করত বলে তাদের বিশ্বাস ছিল।

অসম্ভবের হাতছানি: সুরের পুনর্গঠন

খুব কম তথ্য দিয়ে একটি হারিয়ে যাওয়া সুরকে আবার জীবন্ত করে তোলাটা ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ। এটি অনেকটা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো দিয়ে একটি সম্পূর্ণ আয়না তৈরি করার মতো। ডঃ সেনের কাছে ছিল কিছু গানের লাইন, কিছু সুরের টুকরো, এবং সেই সুরের প্রভাব সম্পর্কে মানুষের স্মৃতি।

তিনি কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতজ্ঞকে সাথে নিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন একজন লোকগীতির বিশেষজ্ঞ, একজন সুরকার যিনি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী, এবং একজন কণ্ঠশিল্পী যিনি বিভিন্ন ধরনের লোকগীতি গাইতে পারেন। তারা একসাথে বসলেন।

প্রথমত, তারা গানের লিরিকগুলো নিয়ে কাজ করলেন। কিছু লাইন অসম্পূর্ণ ছিল, কিছু শব্দের অর্থ স্পষ্ট ছিল না। তারা সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা এবং তাদের জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপট বিচার করে লিরিকগুলোকে একটি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

এরপর আসল চ্যালেঞ্জ – সুর। তারা জানতেন যে এই সুরটি প্রকৃতির সাথে যুক্ত। তাই তারা প্রকৃতির বিভিন্ন ধ্বনি – যেমন বাতাসের শব্দ, বৃষ্টির রিমঝিম, পাখির ডাক, নদীর বয়ে চলা – এগুলোকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন। তারা চেষ্টা করলেন সেই ধ্বনিগুলোকে সুরের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে।

এটি ছিল এক দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া। অনেক রাত কেটেছে বিভিন্ন সুরের বিন্যাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে। একবার মনে হত যেন সঠিক সুরটি পাওয়া গেছে, পরক্ষণেই মনে হত – না, এটা প্রকৃতির ডাক নয়, এটা মানুষের তৈরি।

সংগীতের জাদু এবং স্মৃতির মেলবন্ধন

একদিন, এক ঝড়ো রাতে, যখন বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল, তখন তারা একটি সুর তৈরি করতে সক্ষম হলেন। সেই সুরের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা, আবার একই সাথে এক অদম্য আশা। সুরকাররা বললেন, “এই সুরের মধ্যে প্রকৃতির সেই রুদ্র রূপও আছে, আবার জীবনের সেই অবিচল প্রবাহও আছে।”

কণ্ঠশিল্পী যখন প্রথম সেই সুরটি গাইলেন, তখন ঘরের সবাই যেন এক অন্য জগতে পৌঁছে গেল। প্রবীণদের চোখে জল এসে গেল। তারা বললেন, “ঠিক এই রকমই সুর আমরা শুনতাম! এ যেন হারানো দিনের প্রতিধ্বনি।”

সেই সুরটি শুধু একটি গান ছিল না, এটি ছিল সেই জনগোষ্ঠীর পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক চাবিকাঠি। এটি তাদের শিখিয়েছিল যে, তারা একা নয়। তাদের শিকড় আজও অমলিন।

নতুন প্রজন্মের কানে সেই হারানো সুর

ডঃ সেন এবং তার দল শুধু সুরটি পুনর্গঠন করেই থেমে যাননি। তারা সেই গানটি সেই জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারা গানটির কথা, তার পেছনের গল্প, এবং তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন। তারা এমনভাবে এটি উপস্থাপন করলেন যাতে তরুণরা এর সাথে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

আজ, সেই হারিয়ে যাওয়া সুরটি আবার সেই জনগোষ্ঠীর উৎসবে, তাদের ঘরোয়া আড্ডায়, এমনকি তাদের শিশুদের ঘুমপাড়ানি গানেও ফিরে এসেছে। এটি কেবল একটি গান নয়, এটি তাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রতীক। ডঃ সেনের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, অসম্ভবের মাঝেও সম্ভবকে খুঁজে পাওয়া যায়, যদি থাকে অদম্য ইচ্ছা আর ভালোবাসা।

আমরা প্রায়শই আমাদের চারপাশের ছোট ছোট জিনিসগুলোকে অবহেলা করি। কিন্তু মনে রাখবেন, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া সুরের পেছনেই লুকিয়ে থাকে এক একটি জীবন, এক একটি গল্প, এক একটি সংস্কৃতি। তাদের খুঁজে বের করা, তাদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। কারণ, এই সুরগুলোই আমাদের মানব সভ্যতার অমূল্য সম্পদ।


মন্তব্য করুন