A group of lacrosse players and their coach celebrating a victory on the field.

বিশ্বক্রীড়া : নতুন নক্ষত্র, পুরনো রেকর্ড ভাঙার গল্প

খেলাধুলা






প্রথম আলো ম্যাগাজিন | বিশ্বক্রীড়া : নতুন নক্ষত্র, পুরনো রেকর্ড ভাঙার গল্প


বিশ্বক্রীড়া : নতুন নক্ষত্র, পুরনো রেকর্ড ভাঙার গল্প

ভাবুন তো, এমন এক মুহূর্তের কথা যখন টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে আপনি দেখছেন, একজন সাধারণ মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করছেন। মুহূর্তের মধ্যে বাতাসের সব হিসেব নিকেশ পাল্টে গেল, ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে গেল, আর দর্শকাসনে বসে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষ একই সাথে হেসে উঠলো বা গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ালো। হ্যাঁ, এটাই ক্রীড়াঙ্গনের জাদু, যেখানে নতুনরা এসে পুরনোদের ছাপিয়ে যায়, আর রেকর্ডগুলো কেবলই সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ভাঙার অপেক্ষায়। এই মুহূর্তে, অলিম্পিকের ঠিক পরেই, যখন রিও-র বাতাস তখনও সাফল্যের গন্ধে ভরপুর, তখন এক নতুন মুখ সবার নজর কেড়েছে। নামটা হয়তো এখনই সবার মুখে মুখে নয়, কিন্তু তার পারফরম্যান্স বলে দিচ্ছে, আগামীর দিনগুলো তার।

আকাশছোঁয়া লাফ, কিংবা জলের গভীরে নতুন ছন্দ

মাত্র ১৭ বছর বয়স, অথচ গতি যেন তার রক্তে মেশা। ১০০ মিটার দৌড়ে নতুন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন, যার নামটা এখনই বলে দিচ্ছি – ‘আকাশ’। হ্যাঁ, তার আসল নাম হয়তো অন্য কিছু, কিন্তু এই অলিম্পিক তাকে ‘আকাশ’ নামেই চিনিয়েছে। সে যখন ট্র্যাকে নামে, মনে হয় যেন পায়ের তলায় মাটি নেই, হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। পুরনো সব রেকর্ডকে ধুলোয় মিশিয়ে সে শুধু সোনা জিতল তাই নয়, বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। ভাবুন তো, উসাইন বোল্টের সেই অবিশ্বাস্য রেকর্ডগুলো, যা প্রায় অস্পৃশ্য মনে হতো, আজ সেই রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এই কিশোর। তার এই উত্থান কেবল একটি ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর জন্য এক অদম্য প্রেরণা। যারা ভাবে, “আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়”। আকাশ প্রমাণ করে দেয়, সম্ভব, যদি স্বপ্নটা সত্যি হয় আর পরিশ্রমটা হয় অটুট।

আবার অন্য দিকে, সাঁতারেও আসছে নতুন চমক। ‘সাগরিকা’, নামেই যার পরিচয়, সে যেন জলেরই অন্য এক রূপ। পুরুষদের আধিপত্য যে ক্রীড়াক্ষেত্রের কতখানি, তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই অলিম্পিকে, ২০০০ মিটার ব্যক্তিগত medley-তে তার এক অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। যে দূরত্ব পুরুষদের জন্য কঠিন বলে মনে করা হয়, সেখানে সে প্রায় অলৌকিক ভাবে সবাইকে পেছনে ফেলে দিল। তার এই জয় প্রমাণ করে, লিঙ্গভেদ এখানে গৌণ, আসল হল অদম্য জেদ এবং অবিশ্বাস্য কৌশল। মনে পড়ছে, মাইকেল ফেলপসের সেই দিনগুলোর কথা, যখন তিনি একে একে রেকর্ড ভাঙছিলেন। সাগরিকার চোখেও আমরা সেই একই আগুন দেখতে পাচ্ছি, এক নতুন ফেলপস হয়ে ওঠার স্বপ্ন, জলের গভীরে নিজের রাজত্ব গড়ার স্বপ্ন।

ব্যাটে-বলে ঝড়, বা কোর্টে বিদ্যুতের ঝলকানি

ক্রিকেট, আমাদের প্রিয় খেলা। এই বিশ্বকাপেও আমরা দেখেছি নতুন কিছু মুখের উত্থান। বিশেষ করে, বাংলাদেশ দলের এক তরুণ ওপেনার, যার নাম ‘বিদ্যুৎ’। প্রথম ম্যাচেই সে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, সে শুধু দর্শক হারানোর জন্য মাঠে নামেনি। তার খেলার ধরণটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। প্রতিটি বলে যেন বিদ্যুৎ চমকের মতো আঘাত। সে যে বলে বাউন্ডারি মেরেছে, তার প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস আর সাহসের মেলবন্ধন। পুরনো সব কিংবদন্তিদের রেকর্ড সে এক এক করে টপকে যেতে শুরু করেছে। ভাবুন তো, শচিন টেন্ডুলকারের সেই দীর্ঘ ক্রিকেট জীবন, কত রেকর্ড তিনি তৈরি করেছেন! কিন্তু আজকের এই তরুণ প্রজন্ম, তাদের সামনে সেই রেকর্ডগুলো কেবলই মাইলফলক। বিদ্যুৎ এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে দেখলে মনে হয়, সে শুধু নিজের সেরাটা দিতে চায়, আর তার ফলস্বরূপ রেকর্ডগুলো এমনিতেই ভেঙে যায়।

ফুটবলেও একই চিত্র। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে নতুন তারকারা জ্বলে উঠছে। ‘অগ্নি’, এই নামটা এখন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে বেশ পরিচিত। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সে তার ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে। তার গতি, ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং – সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ ফুটবলার। যখন সে মাঠে নামে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা আতঙ্কে থাকে। লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের সময়েও এমন প্রতিভার দেখা পাওয়া বিরল। অগ্নি যেন নতুন প্রজন্মের জন্য এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। সে প্রমাণ করছে, বয়স এখানে কোনো বাধা নয়, বরং নতুন কিছু করার প্রেরণা।

প্রজন্মের বদল, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

নতুন নক্ষত্রের এই উত্থান কিন্তু পুরনোদের সম্মানকে কমিয়ে দেয় না। বরং, তারা নতুনদের জন্য পথ তৈরি করে দেয়। কিংবদন্তিরা themselves নতুনদের অনুপ্রাণিত করেন। যখন পুরনো রেকর্ডগুলো ভাঙে, তখন আমরা দেখি, সেই পুরনো রেকর্ডধারীরাও নতুন চ্যাম্পিয়নদের অভিনন্দন জানান। এটা আসলে ক্রীড়াঙ্গনের এক সুন্দর ঐতিহ্য। যেমন, টেনিসের কথা ধরা যাক। নোভাক জোকোভিচ, রাফায়েল নাদাল, রজার ফেদেরারের সেই ঐতিহাসিক লড়াইগুলো আমরা দেখেছি। কিন্তু আজ, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা, যেমন ‘ঝড়ো’ বা ‘প্রান্তিক’, তারা সেই রাজত্বে ভাগ বসাতে শুরু করেছে। তাদের খেলার ধরণ, তাদের আগ্রাসন, সবকিছুই ভিন্ন। তারা প্রমাণ করছে, টেনিস শুধু চার গ্র্যান্ড স্ল্যাম নয়, এটি এক নিরন্তর পরিবর্তনের খেলা।

এই পরিবর্তনটা শুধু পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষণের নতুন পদ্ধতি, এবং খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি। আজকাল খেলোয়াড়রা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রশিক্ষিত, অনেক বেশি সচেতন। ডায়েট, ফিটনেস, মানসিক স্বাস্থ্য – সবকিছুই এখন বিজ্ঞানসম্মত। তাই, পুরনো রেকর্ডগুলো ভাঙা হয়তো আগের চেয়ে সহজ হয়েছে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং নিষ্ঠা।

শেষের কথা

বিশ্বক্রীড়া এক জীবন্ত সত্তা। এটি সবসময়ই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। নতুনরা আসবে, পুরনোদের জায়গা নেবে, রেকর্ড ভাঙবে, এবং নতুন রেকর্ড তৈরি করবে। এটাই নিয়ম, এটাই সৌন্দর্য। আজ যারা নতুন তারকা, কাল তারাই হবেন কিংবদন্তি। আর তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হবে নতুন প্রজন্ম। তাই, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শুধু উপভোগ করুন এই পরিবর্তন, এই উত্থান-পতন, এই নতুন গল্পগুলো। কারণ, প্রতিটি নতুন রেকর্ড, প্রতিটি নতুন তারকার জন্ম আসলে মানবজাতির অদম্য ইচ্ছাশক্তিরই এক নতুন প্রকাশ। আগামী দিনে আমরা আরও কত নতুন বিস্ময় দেখব, তা কেবল সময়ই বলবে। আর আমরা, দর্শক হিসেবে, সেই সব মুহূর্তগুলোর সাক্ষী হতে পেরে গর্বিত।


মন্তব্য করুন