Explore a purple-hued abstract cosmic scene with floating shapes and bubbles.

মহাকাশের অজানা কথা: যা জানা নেই আজও!

অজানা তথ্য






মহাকাশের অজানা কথা: যা জানা নেই আজও!


মহাকাশের অজানা কথা: যা জানা নেই আজও!

একবার ভাবুন তো, রাতের আকাশে আমরা কোটি কোটি নক্ষত্র দেখি, তাদের কারো আলো আমাদের চোখে পৌঁছাতে সময় লেগেছে হাজার হাজার বছর। কিন্তু এই সুবিশাল মহাবিশ্বের কতটুকুই বা আমরা সত্যিই জানি? মনে করুন, আপনি একটি বিশাল সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছেন, আর আপনার হাতে আছে এক ফোঁটা জল। সেই এক ফোঁটা জল হলো মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানা জ্ঞান, আর বাকি বিশাল সমুদ্রটাই হলো অজানা। আজকের এই আলোচনা সেই অজানা সমুদ্রের কিছু বিস্ময়কর দিক নিয়ে।

অদৃশ্য দানবদের রাজত্ব: ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

মহাকাশ শুধু নক্ষত্র, গ্রহ আর গ্যালাক্সিতেই ভরা নয়। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, আমরা যা দেখি, যা অনুভব করি, তা মহাবিশ্বের মোট শক্তির মাত্র ৫%! তাহলে বাকি ৯৫% কোথায়? এখানেই আসে এক রহস্যময় জুটি – ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।

ডার্ক ম্যাটার হলো এমন এক অদৃশ্য পদার্থ যা আলো নিঃসরণ করে না, শোষণও করে না। আমরা একে দেখতেও পাই না, স্পর্শও করতে পারি না। কিন্তু এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় তার অভিকর্ষ বলের প্রভাবে। ভাবুন তো, যেন অদৃশ্য দৈত্যরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন বস্তুকে টেনে ধরে রেখেছে, যার ফলে গ্যালাক্সিগুলো ভেঙে পড়ছে না! বিজ্ঞানীরা এখনো এর আসল রূপ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এটা কি কোনো নতুন কণার সমষ্টি, নাকি অন্য কিছু? মহাকাশের এই অদৃশ্য কারিগরদের রহস্য ভেদ করতে পারলে পদার্থবিদ্যার অনেক তত্ত্বই নতুন করে লিখতে হবে।

অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি আরও এক ধাপ এগিয়ে। এটা মহাবিশ্বকে শুধু স্থিরই রাখছে না, বরং এটিকে দ্রুতগতিতে প্রসারিতও করছে! মনে করুন, মহাবিশ্ব হলো একটি বেলুন, আর গ্যালাক্সিগুলো তার উপর আঁকা বিন্দু। ডার্ক এনার্জি যেন সেই বেলুনের ভেতর বাতাস ফুঁকে চলেছে, আর বিন্দুগুলো একে অপরের থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। এই শক্তি কোথা থেকে আসছে, এর প্রকৃতি কী – এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা। এই দুই রহস্যময় উপাদানের কারণে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা।

গ্রহের ভিড়ে অচেনা অতিথি

আমরা সৌরজগতে আটটি গ্রহের কথা জানি। কিন্তু মহাবিশ্ব তো কেবল আমাদের সৌরজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই আছে শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র, আর এই নক্ষত্রগুলোর চারপাশে ঘুরছে হাজার হাজার গ্রহ! এদের মধ্যে অনেকেই আমাদের পৃথিবীর মতো পাথুরে, আবার অনেকেই বৃহস্পতির মতো বিশাল গ্যাসীয় পিণ্ড।

তবে মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এমন অনেক গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন যা আমাদের পরিচিত গ্রহগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। যেমন, ‘হট জুপিটার’ (Hot Jupiters) – বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ যারা তাদের নক্ষত্রের এত কাছাকাছি ঘোরে যে তাদের তাপমাত্রা অগ্নিকুণ্ডের মতো উত্তপ্ত! আবার আছে ‘সুপার আর্থ’ (Super-Earths) – পৃথিবীর চেয়ে বড় কিন্তু নেপচুনের চেয়ে ছোট, যাদের পৃষ্ঠদেশ পাথুরে হতে পারে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো ‘অসম্ভব’ গ্রহগুলো। কিছু গ্রহ আছে যারা তাদের নক্ষত্রের এত কাছে ঘোরে যে মনে হয় তাদের পৃষ্ঠদেশ গলে যাবে, আবার কিছু গ্রহ আছে যারা এত দূরে ঘোরে যে তাদের বরফের চাদরে ঢেকে থাকার কথা। কিন্তু কিছু ‘অসম্ভব’ গ্রহ তাদের নিজস্ব উপায়ে টিকে আছে, যা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এদের মধ্যে প্রাণের সম্ভাবনা আছে কি না, তা নিয়ে চলছে গবেষণা।

ব্ল্যাক হোলের টান: মহাকাশের অমোঘ আকর্ষণ

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর – নামটা শুনলেই কেমন গা ছমছম করে ওঠে, তাই না? এরা মহাকাশের এমন এক জায়গা যেখানে অভিকর্ষ বল এতটাই প্রবল যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে পালাতে পারে না। ভাবুন তো, কতখানি শক্তিশালী হলে এই ঘটনা ঘটে!

ব্ল্যাক হোল তৈরি হয় বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যুর পর। যখন একটি বড় নক্ষত্র তার জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে, তখন সেটি নিজের অভিকর্ষের টানে ভেঙে পড়ে এবং একটি অত্যন্ত ঘন বস্তুতে পরিণত হয় – এই হলো ব্ল্যাক হোল। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল আছে, যার নাম স্যাজিটারিয়াস এ* (Sagittarius A*)। এটি সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ বেশি!

কিন্তু ব্ল্যাক হোল নিয়ে আরও অনেক রহস্য আছে। তারা কি সত্যিই ‘গহ্বর’? তাদের ভেতর কী আছে? সেখানে গেলে কী হয়? আমরা শুধু জানি যে তাদের কাছাকাছি গেলে সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এখনো ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon) – অর্থাৎ যে সীমার পর আর ফেরা যায় না – সেই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোল থেকে নির্গত হওয়া ‘হকিং রেডিয়েশন’ (Hawking Radiation) নিয়েও তত্ত্ব দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে ব্ল্যাক হোলও নাকি পুরোপুরি ‘কালো’ নয়, বরং ক্ষীণভাবে শক্তি বিকিরণ করে। তবুও, ব্ল্যাক হোলের ভেতরের জগৎ এখনো আমাদের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।

মহাকাশের শব্দ: মহাজাগতিক ফিসফিসানি

আমরা সাধারণত মহাকাশকে নিঃশব্দ মনে করি। কারণ শব্দ তরঙ্গ চলাচলের জন্য বায়ুমণ্ডল বা অন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয়, যা মহাকাশে নেই। কিন্তু তাই বলে মহাকাশ কি একেবারে শব্দহীন? বিজ্ঞানীরা মহাকাশের এমন কিছু ‘শব্দ’ ধরেছেন যা আমাদের অবাক করে দিতে পারে!

যেমন, নাসার বিজ্ঞানীরা মহাকাশের কিছু অঞ্চলে ‘মহাজাগতিক শব্দ’ (Cosmic Sounds) রেকর্ড করেছেন। এগুলো আসলে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর কম্পন বা তরঙ্গ, যা বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে ধরা সম্ভব। এগুলোকে সরাসরি ‘শব্দ’ না বলে মহাজাগতিক ফিসফিসানি বা গুঞ্জন বলাই ভালো। যেমন, কিছু ব্ল্যাক হোল থেকে নির্গত হওয়া মহাজাগতিক তরঙ্গের প্যাটার্নকে তারা ‘সুর’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

আবার, মহাকাশে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণ, যেমন সুপারনোভা (Supernova) – যখন একটি নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয় – তখন যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা এক ধরনের মহাজাগতিক তরঙ্গ তৈরি করে। এই তরঙ্গগুলো পৃথিবীর গ্রহেও এসে পৌঁছায়। আমরা সরাসরি শুনতে না পেলেও, এই তরঙ্গগুলো মহাকাশের নানা ঘটনা সম্পর্কে আমাদের মূল্যবান তথ্য দেয়। ভাবুন তো, মহাকাশের এই অদৃশ্য শব্দগুলো যেন এক একটি মহাজাগতিক বার্তা, যা আমাদের অচেনা জগতের কথা বলে চলেছে।

অন্য গ্রহে জীবন: আমরা কি একা?

মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না – এই প্রশ্নটি মানবজাতিকে যুগ যুগ ধরে ভাবিয়েছে। আমরা কি মহাবিশ্বে একা? নাকি অন্য কোনো গ্রহে, অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরতে থাকা কোনো গ্রহেও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। আমাদের সৌরজগতেই মঙ্গল গ্রহ, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা (Europa) বা শনির উপগ্রহ এনসেলাডাস (Enceladus)-এর মতো জায়গায় প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। কারণ এসব জায়গায় তরল জলের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য।

অন্যদিকে, এক্সোপ্ল্যানেট (Exoplanet) বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোতে প্রাণের সন্ধান আরও রোমাঞ্চকর। অনেক গ্রহেই এমন পরিবেশের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে বায়ুমণ্ডল আছে, তাপমাত্রা সহনীয় এবং জলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ‘হ্যাবিটাবল জোন’ (Habitable Zone) বা বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা গ্রহগুলোর উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে আমরা এসব গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে সেখানে অক্সিজেনের মতো জীবনের সূচক অণুর সন্ধান করছি। যদিও এখনো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি, তবুও এই অন্বেষণ থেমে নেই। কারণ, যদি আমরা জানতে পারি যে আমরা একা নই, তাহলে মানবজাতির মহাবিশ্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে যাবে!

মহাকাশ এক অপার বিস্ময়। আমরা যতটুকুই জানি, তার চেয়ে অজানাই রয়ে গেছে অনেক বেশি। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন আবিষ্কার আমাদের এই মহাবিশ্বের গভীরতা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। এই অজানাই আমাদের কৌতূহলকে উস্কে দেয়, আমাদের আরও জানতে উদ্বুদ্ধ করে। কে জানে, হয়তো আগামী প্রজন্মই মহাকাশের এমন সব রহস্য উন্মোচন করবে যা আমরা আজ কল্পনাও করতে পারি না!


মন্তব্য করুন