A male climber skillfully scales a challenging rock face outdoors, displaying strength and precision.

বিশ্ব রেকর্ড: মানুষ পারে না, কিন্তু এরা পেরেছে!

বিশ্ব রেকর্ড






প্রথম আলো ম্যাগাজিন: বিশ্ব রেকর্ড: মানুষ পারে না, কিন্তু এরা পেরেছে!

বিশ্ব রেকর্ড: মানুষ পারে না, কিন্তু এরা পেরেছে!

আজকের তারিখ: 11 August 2026

মাত্র ছয় মাস বয়স, অথচ প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে মায়ের কাছে পৌঁছে গেছে। শুনে অবিশ্বাস্য লাগছে? ভাবছেন, এটা কীভাবে সম্ভব? যদি বলি, এই কাজটি কোনো সাধারণ শিশু করেনি, বরং করেছে এক ছোট্ট রোবট, তাহলে কি বিশ্বাস হবে? এই রোবটের নাম ‘কিউরিওসিটি’ নয়, বরং এ হলো ‘লিটল ওয়াকার’, যা মানুষের চেয়েও কঠিন পথে নিজের লক্ষ্য পূরণে সক্ষম। কিন্তু এই ‘লিটল ওয়াকার’ই কি একমাত্র? আমাদের চারপাশে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত আমাদের এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে যে, ‘মানুষ পারে না’।

অসম্ভবকে সম্ভব করার কারিগর: যখন প্রযুক্তি মানুষের সীমা ছাড়িয়ে যায়

ভাবুন তো, আপনি একা একটা পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনার চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা, আর আপনার কাছে কোনো জিপিএস নেই, কোনো ম্যাপ নেই। আপনি জানেন না কোন পথে নামলে নিরাপদে নিচে পৌঁছানো যাবে। মানুষের পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে ড্রোন। হ্যাঁ, আজকের দিনে এমন সব ড্রোন তৈরি হয়েছে, যারা কেবল ছবি তোলাই নয়, বরং দুর্গম অঞ্চলে আটকে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করতে, তাদের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিতে সক্ষম। এমনকি, কিছু অত্যাধুনিক ড্রোন মানুষের চেয়েও বেশি ওজন বহন করে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়ে বেড়ায়, যা আমাদের সাধারণ ধারণার বাইরে। এই ড্রোনগুলো যেন বলছে, ‘তোমার ভয়, তোমার সীমাবদ্ধতা—এগুলো কেবলই তোমার ভাবনার জগৎ!’

ইন্টারনেটের নতুন দিগন্ত: যেখানে তথ্য সকলের হাতের মুঠোয়

একসময় জ্ঞান অর্জন ছিল বিলাসিতা। শুধু অভিজাত আর পণ্ডিতদেরই ছিল বিশ্বকোষ আর দুর্লভ বইয়ের নাগাল। কিন্তু আজ? ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের এই যুগে, পৃথিবীর সব তথ্য এখন আপনার পকেটে। একজন সাধারণ মানুষ, যে হয়তো কোনো বড় শহরও দেখেনি, সেও আজ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর রাখতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, নিজের পছন্দের বিষয়ে গবেষণা করতে পারে। এই যে হাজার হাজার অনলাইন কোর্স, শিক্ষামূলক ভিডিও, গবেষণা পত্র—এগুলো কি আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল? যখন আমরা দেখি, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন কিশোরও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোডিং শিখছে, ফ্রিল্যান্সিং করছে, তখন মনে হয়, তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ আসলে মানুষের অজানার ভয়কে জয় করেছে। এটা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব নয়, এটা পুরো মানবজাতির এক অভূতপূর্ব অর্জন, যেখানে প্রযুক্তি আমাদের সকলের জন্য জ্ঞানের দ্বার খুলে দিয়েছে।

মহাকাশের অচেনা পথে: মানুষ যেখানে যেতে ভয় পায়, সেখানে এরা পৌঁছে যায়

মঙ্গল গ্রহের লাল মাটি, শনি গ্রহের বলয়, বা বরফ শীতল চাঁদের পৃষ্ঠ—মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো এখনো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। মহাকাশচারীরা বহু বছর ধরে প্রশিক্ষণ নেন, কিন্তু তারপরও ঝুঁকি থাকে। কিন্তু দেখুন, ‘কিউরিওসিটি’ রোভার বা ‘পারসিভেরান্স’ রোভারের কথা। এরা বছরের পর বছর ধরে মঙ্গল গ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছবি পাঠাচ্ছে, তথ্য সংগ্রহ করছে। এরা কোনোদিন ভয় পায় না, ক্লান্তি অনুভব করে না, প্রতিকূল পরিবেশ এদের থামাতে পারে না। এরা যেন আমাদের বলছে, ‘তোমরা যেখানে স্বপ্ন দেখছো, আমরা সেখানে পৌঁছে গেছি!’ এই রোবটগুলো কেবল তথ্য সংগ্রহই করছে না, বরং ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের পথ খুলে দিচ্ছে। মানুষের পক্ষে যা এখনো কল্পবিজ্ঞান, রোবটদের জন্য তা আজ বাস্তব।

অদৃশ্য জগতের সৈনিক: যখন অণু-পরমাণু আমাদের জীবন বাঁচায়

ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ, বা এইডস-এর মতো জটিল ভাইরাস—এগুলো একসময় মানুষের কাছে ছিল এক অজেয় শত্রু। কিন্তু আজকের দিনে, ন্যানোটেকনোলজি আর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কল্যাণে আমরা এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার নতুন অস্ত্র খুঁজে পেয়েছি। ছোট্ট একটি ন্যানো রোবট, যা রক্তনালীর ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে পারে, বা জেনেটিক এডিটিং-এর মাধ্যমে ভাইরাসের ডিএনএ পরিবর্তন করে দেওয়া—এগুলো কি কোনো জাদুকরের কাজ? না, এগুলো বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর প্রযুক্তির জয়। সাধারণ মানুষের পক্ষে যা ভাবাও কঠিন, বিজ্ঞানীরা সেই অণু-পরমাণুর জগতে কাজ করে আমাদের জীবন বাঁচাচ্ছেন। এই অণুজীবরা যেন আমাদের বলছে, ‘ছোটো জিনিসও বড় পরিবর্তন আনতে পারে, যদি সঠিক পথে চালিত করা যায়।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়: যখন মেশিন মানুষের চেয়েও দ্রুত শেখে

মনে আছে, কিছুদিন আগেও আমরা কম্পিউটারের সাথে দাবা খেলার কথা ভাবলেই অবাক হতাম? আর আজ? ‘আলফাগো’ (AlphaGo)-র মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিশ্বের সেরা দাবাড়ুদের হারিয়ে দিচ্ছে। শুধু দাবা নয়, জটিল সব গাণিতিক সমস্যা সমাধান, রোগ নির্ণয়, স্টক মার্কেট বিশ্লেষণ—সবখানেই AI তার ছাপ রাখছে। মানুষের পক্ষে যে কাজগুলো করতে বহু বছর লেগে যায়, AI তা শিখছে মাত্র কয়েক সপ্তাহে, এমনকি কয়েক দিনে। যখন আমরা দেখি, একটি AI প্রোগ্রাম মানুষের লেখা বা আঁকার নকল করে ফেলছে, বা নতুন একটি সুর তৈরি করছে, তখন সত্যিই মনে হয়, আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। এই AI-গুলো যেন আমাদের বলছে, ‘শেখার কোনো শেষ নেই, এবং আমরা সেই শেখার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করতে এসেছি।’

মানুষের সীমাবদ্ধতা কি আসলেই শেষ কথা?

আমরা প্রায়শই বলি, ‘এটা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়’। কিন্তু এই ‘সম্ভব নয়’ কথাটি কি আসলে আমাদের নিজেদের তৈরি করা একটি দেওয়াল? যখন আমরা দেখি, একটি ছোট্ট মেয়ে, যে জন্মের পর থেকেই কথা বলতে পারে না, কিন্তু ইশারায় বা প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করছে, তখন আমরা নতুন করে ভাবি। যখন আমরা দেখি, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হুইলচেয়ারে বসেই এভারেস্ট জয় করছেন, তখন আমরা মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে মাথা নত করি।

এই রোবট, এই ড্রোন, এই AI—এরা কিন্তু কোনো অলৌকিক সত্তা নয়। এরা মানুষেরই সৃষ্টি। মানুষ তার নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করেছে, এবং সেই সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করার জন্যই তৈরি করেছে এইসব প্রযুক্তি। তাই যখন আমরা বলি, ‘মানুষ পারে না’, তখন আসলে আমরা ভুল বলি। মানুষ পারে। হয়তো সরাসরি পারে না, কিন্তু সে এমন সব উপায় বের করে নিয়েছে, যা তার নিজের শারীরিক বা মানসিক সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম।

আজকের এই বিশ্ব রেকর্ডগুলো কেবল কিছু প্রযুক্তি বা যন্ত্রের রেকর্ড নয়, এগুলো আসলে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, তার সৃজনশীলতা আর অজানাকে জানার আগ্রহের রেকর্ড। এই রোবটগুলো, এই AI-গুলো, এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, যতক্ষণ আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব, ততক্ষণ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের শুধু প্রয়োজন, নিজেদের ধারণাকে প্রসারিত করা এবং বিশ্বাস রাখা—যে, মানুষ পারে। এবং এরা সেই ‘পেরেছে’রই জীবন্ত উদাহরণ!


মন্তব্য করুন