Man in a space suit rides public transit in London, highlighting a unique and whimsical scene.

মহাকাশে জীবনের নতুন সূত্র!

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা






মহাকাশে জীবনের নতুন সূত্র!


মহাকাশে জীবনের নতুন সূত্র!

কল্পনা করুন, আপনি গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। লক্ষ লক্ষ তারার ভিড়ে যদি হঠাৎ একটি বার্তা আসে, “আমরা এখানে আছি!” – কেমন লাগবে আপনার? এই প্রশ্নটা হয়তো আমাদের সবার মনেই উঁকি দিয়েছে কোনো না কোনো সময়। এতদিন আমরা শুধু “জীবন আছে কি নেই” এই বিতর্কে সীমাবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু আজ, 17 July 2026-এ দাঁড়িয়ে, মহাকাশ গবেষণার এমন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, যা জীবনের সংজ্ঞাই পাল্টে দিতে পারে। আমরা এখন শুধু জীবনের সন্ধান করছি না, বরং জীবনের নতুন সূত্র খুঁজছি – এমন সব সম্ভাবনার কথা ভাবছি যা আমাদের পরিচিত জীবনের ধারণার বাইরে।

গ্রহের চেয়েও অদ্ভুত জগৎ!

আমরা সাধারণত ভাবি, জীবন মানেই জল, বাতাস, আর একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা। কিন্তু মহাকাশ আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন বিস্ময় উপহার দিচ্ছে। ভাবুন তো, এমন একটি গ্রহ যেখানে বরফ গলতে শুরু করলেই সেখানে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে, কিন্তু তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক থাকে, তখন জীবন ঘুমিয়ে পড়ে! অথবা এমন এক উপগ্রহ, যার পৃষ্ঠে তরল মিথেনের সমুদ্র, আর সেই মিথেনের সমুদ্রেই জন্ম নিচ্ছে অজানা কোনো সত্তা।

সম্প্রতি, নাসার ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’ (JWST) আমাদের এই ধারণাগুলোকে আরও প্রসারিত করেছে। এটি দূরবর্তী একটি এক্সোপ্ল্যানেট, নাম ‘K2-18 b’-এর বায়ুমণ্ডলে ডাইমিথাইল সালফাইড (DMS) নামের একটি অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে। কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ পৃথিবীতে, DMS তৈরি হয় মূলত জীবন্ত সামুদ্রিক প্রাণী থেকে, বিশেষ করে প্ল্যাঙ্কটন থেকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই DMS-এর উপস্থিতি মহাকাশে প্রাণের টিকে থাকার জন্য আমাদের পরিচিত পরিবেশের চেয়ে অনেক ভিন্ন পরিবেশের সম্ভাবনাকে জোরালো করে।

অর্থাৎ, আমরা হয়তো জীবনের জন্য কেবল “পৃথিবীর মতো” পরিবেশ খুঁজছি, কিন্তু মহাকাশে জীবন হয়তো নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে অচিন্তনীয় সব পরিস্থিতিতে। এটা অনেকটা এমন যে, আপনি শুধু ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটতে জানেন, কিন্তু হঠাৎ দেখলেন কেউ উত্তপ্ত লাভাতেও দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছে!

অক্সিজেন ছাড়াই শ্বাস?

আমাদের পৃথিবীতে জীবনের জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। কিন্তু মহাকাশের অন্য প্রান্তে কি একই নিয়ম প্রযোজ্য? উত্তর হলো – সম্ভবত না!

কিছু জীবাণু আছে যারা অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই বাঁচতে পারে। এদের বলা হয় অ্যানারোবিক (Anaerobic)। এরা সালফার, লোহা বা এমনকি হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করেও শক্তি উৎপাদন করতে পারে। ভাবুন তো, মঙ্গল গ্রহে বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপাতে, যেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম বা নেই বললেই চলে, সেখানে এই ধরনের অ্যানারোবিক জীবনের অস্তিত্ব থাকা খুবই সম্ভব।

সম্প্রতি, বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ধরনের ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেছেন, যারা ভূগর্ভস্থ খনিজ থেকে শক্তি শোষণ করে বেঁচে থাকে। এরা সূর্যের আলো ছাড়াই, পৃথিবীর গভীরতম গুহায় বা সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে প্রায় কোনো আলো পৌঁছায় না, সেখানে দিব্যি টিকে আছে। এই আবিষ্কার আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, জীবনকে আমরা কতটা সংকীর্ণভাবে ভেবেছি! মহাকাশে, বিশেষ করে পাথুরে গ্রহ বা বরফের নিচের সমুদ্রগুলোতে, এই ধরনের জীবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

ভূগর্ভস্থ জীবনের হাতছানি

মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে এখন প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু বহু বছর আগে সেখানে জল ছিল। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সেই সময়ে যদি কোনো জীব সেখানে জন্ম নিয়ে থাকে, তবে তারা হয়তো গ্রহের গভীরে, লাভা টিউব বা ভূগর্ভস্থ গুহাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল। আজও সেখানে সেই প্রাণের অবশিষ্টাংশ বা এমনকি সরাসরি জীবন্ত রূপ টিকে থাকতে পারে।

বৃহস্পতির বরফ ঢাকা উপগ্রহ ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহ এনসেলাডাস-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এদের পৃষ্ঠে বরফের পুরু আস্তরণের নিচে রয়েছে বিশাল বিশাল তরল জলের সমুদ্র। এই সমুদ্রগুলো পৃথিবীর মহাসাগরের মতোই গভীর এবং সেখানে আগ্নেয়গিরির মতো উষ্ণ প্রস্রবণ থাকতে পারে, যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করতে পারে।

মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি’ এনসেলাডাসের বরফের ফাটল থেকে যে জলীয় বাষ্প নির্গত হতে দেখেছে, তাতে শুধু জলই নয়, মিথেন, অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য জৈব অণুর সন্ধানও পাওয়া গেছে। এটা যেন এক বিশাল মহাজাগতিক স্যুপ, যেখানে নতুন জীবনের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

নতুন রাসায়নিক সমীকরণ?

আমরা জীবন বলতে যা বুঝি, তার মূল ভিত্তি হলো কার্বন-ভিত্তিক অণু। ডিএনএ (DNA) এবং প্রোটিন—এগুলোই আমাদের পরিচিত জীবনের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু মহাকাশে কি জীবনের জন্য অন্য কোনো রাসায়নিক ভিত্তি থাকতে পারে?

বিজ্ঞানীরা সিলিকন-ভিত্তিক জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন। সিলিকন কার্বনের মতোই চারটি বন্ধন তৈরি করতে পারে, তাই তাত্ত্বিকভাবে এটি জীবনের ভিত্তি হতে পারে। যদিও সিলিকন-ভিত্তিক অণুগুলো কার্বনের মতো স্থিতিশীল নয়, তবুও কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন চরম ঠান্ডা বা চরম গরম আবহাওয়ায়, এরা টিকে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, কিছু গবেষক মনে করেন, জীবন হয়তো অ্যামোনিয়া বা মিথেনের মতো তরল দ্রাবকে তৈরি হতে পারে, যেখানে জল নেই। যেমন, শনির উপগ্রহ টাইটানে তরল মিথেনের সমুদ্র রয়েছে। সেখানে তাপমাত্রা এতটাই কম যে জল সেখানে বরফ হয়ে জমে থাকে। কিন্তু যদি মিথেনকে দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রাণের উদ্ভব হওয়া অসম্ভব নয়।

মহাজাগতিক বার্তা: আমরা কি প্রস্তুত?

যদি কোনো দিন আমরা মহাকাশে এমন জীবনের সন্ধান পাই যা আমাদের পরিচিত ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? আমরা কি তাকে গ্রহণ করতে পারব? আমাদের বিজ্ঞান, আমাদের দর্শন, আমাদের ধর্ম—সবকিছুই তো মানবকেন্দ্রিক জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

মহাকাশে জীবনের নতুন সূত্রের সন্ধান আমাদের কেবল নতুন গ্রহে বা উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে না, বরং জীবনের মৌলিক সংজ্ঞাটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এটা আমাদের শেখাচ্ছে যে, মহাবিশ্ব আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং বিস্ময়কর।

আজকের এই তথ্যগুলো আমাদের এক নতুন পথে চালিত করছে। আমরা এখন শুধু “আমরা কি একা?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি না, বরং “জীবন আসলে কী?” এই গভীরতম প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি। আর এই নতুন সূত্রগুলো আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা হয়তো নিজেদেরও নতুন করে চিনতে শিখব। মহাকাশের অনন্ত পানে আমাদের এই যাত্রা কেবল শুরু!


মন্তব্য করুন