সময়ের জাল ভেদ! বিজ্ঞানীরা কি ফেরাচ্ছেন অতীত?
কল্পনা করুন তো, আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার প্রিয় নানি তারুণ্যের রূপে আপনার সামনে হাজির। অথবা, হয়তো স্কুলের সেই প্রিয় বন্ধুটি, যার সাথে যোগাযোগ হারিয়ে গেছে বহু বছর, সে আবার আপনার পাশে বসে হাসছে। কি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? ঠিক এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটি নিয়েই আজ আমাদের এই আয়োজন। সময়ের স্রোতকে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়া—এটা কি কেবলই রূপকথা, নাকি বিজ্ঞান সত্যি সত্যি এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে এগোচ্ছে?
আলবার্ট আইনস্টাইনের সেই দুঃসাহসী ধারণা
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণাটাই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সময় আসলে পরম কিছু নয়। এটি আপেক্ষিক। আলোর গতির কাছাকাছি গেলে সময় ধীর হয়ে যায়। ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো? ভাবুন তো, আপনি যদি রকেটে চড়ে আলোর গতির কাছাকাছি ভ্রমণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তবে দেখবেন আপনার বন্ধুদের বয়স আপনার চেয়ে বেশি বেড়ে গেছে। এটা কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা, তাই না? কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর তত্ত্বে সময়ের পেছনের দিকে যাত্রার ধারণাও উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেছিলেন, যদি মহাকাশে এমন কোনো পথ (wormhole) থাকে যা মহাকাশের দুটি ভিন্ন বিন্দুকে যুক্ত করে, তাহলে হয়তো সময়েরও পেছনের বিন্দুতে পৌঁছানো সম্ভব।
ওয়ার্মহোলের হাতছানি: মহাকাশের শর্টকাট
ওয়ার্মহোল—নামটা শুনলেই কেমন একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার মনে হয়, তাই না? এটা যেন মহাকাশের এক গোপন সুড়ঙ্গ, যা আমাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, এমনকি সময়েরও এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে পৌঁছে দিতে পারে। অনেকটা যেমন ঢাকা থেকে চিটাগাং যাওয়ার সময় আমরা প্লেনে উড়ে যাই, যা সাধারণ বাসে যাওয়ার চেয়ে অনেক কম সময় নেয়। ওয়ার্মহোল মহাকাশের ক্ষেত্রে সেরকমই একটা শর্টকাট। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি আমরা এমন কোনো ওয়ার্মহোল খুঁজে পাই এবং সেটিকে স্থিতিশীল রাখতে পারি (কারণ বেশিরভাগ ওয়ার্মহোল নাকি খুবই অস্থির), তাহলে হয়তো আমরা সময়ের অতীতে পাড়ি জমাতে পারব। চিন্তা করুন তো, একবার যদি আমরা ডাইনোসরদের যুগে যেতে পারতাম! বা হয়তো প্রাচীন সভ্যতার উত্থান সরাসরি দেখতে পেতাম!
কোয়ান্টাম ফিজিক্সের বিস্ময়কর জগৎ
শুধু আইনস্টাইনের তত্ত্বই নয়, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আরও একটি শাখা, কোয়ান্টাম ফিজিক্স, সময়ের রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কোয়ান্টাম ফিজিক্স পদার্থের অতি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে আলোচনা করে। এই ক্ষুদ্র জগতে কিছু এমন ঘটনা ঘটে যা আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে ধরা পড়ে না। যেমন, “কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট”। ভাবুন তো, দুটো কয়েনকে এমনভাবে তৈরি করা হলো যে, আপনি একটি কয়েনকে ছুঁড়ে না দেখেই বলে দিতে পারবেন অন্য কয়েনটি কি হেড না টেল পড়েছে। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট অনেকটা সেরকমই, যেখানে দুটি কণা একে অপরের সাথে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে, একটির অবস্থা জানলে অন্যটির অবস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন।
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টকে কাজে লাগিয়ে হয়তো তথ্য আদান-প্রদানে সময়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, বর্তমান থেকে অতীতে বা ভবিষ্যতে তথ্য পাঠানো যেতে পারে। যদিও এটা এখনো অনেকটাই তাত্ত্বিক পর্যায়ে আছে, তবুও এই ধারণাটাই আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
সময় পরিভ্রমণের চেনা-অচেনা বাধা
তবে, সময় পরিভ্রমণের পথ মোটেই মসৃণ নয়। অসংখ্য বাধার দেয়াল রয়েছে এর সামনে। প্রথমত, ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি। যদি থেকেও থাকে, তবে তা খুঁজে বের করা এবং তা ব্যবহারযোগ্য করে তোলা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, যদি আমরা অতীতে যাই, তাহলে কি আমরা নিজেরাই সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বদলে দিতে পারব?
ধরুন, আপনি অতীতে গিয়ে আপনার দাদাকে তার গাড়ি কেনার টাকাটা দেননি, যার ফলে তিনি গাড়িটি কেনেননি। কিন্তু যদি আপনার দাদাই সেই গাড়িটি না কিনতেন, তাহলে হয়তো আপনার বাবা-মা-র দেখা হতো না, এবং আপনি নিজেও হয়তো জন্মগ্রহণ করতেন না! এই প্যারাডক্স বা হেঁয়ালিকে বলা হয় “গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স”। বিজ্ঞানীরা এই প্যারাডক্স এড়ানোর জন্য নানা তত্ত্ব দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, হয়তো অতীতে গেলে আমরা মূল সময়ের ধারাকে বদলাতে পারব না, বরং নতুন একটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব তৈরি হবে। আবার কেউ বলছেন, মহাবিশ্ব নিজেই এমনভাবে নিজেকে সামলে নেবে যাতে কোনো প্যারাডক্স তৈরি না হয়।
বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা
বিজ্ঞানীরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জ্যামাইকার পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেল রবার্তো, যিনি “টাইম ট্রাভেল থিওরিস্ট” হিসেবে পরিচিত, তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং মহাকর্ষের নিয়মগুলোকে একত্রিত করে সময়ের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছেন। তিনি মনে করেন, যদি আমরা মহাকাশে এমন কিছু বিশেষ কণা (exotic matter) তৈরি করতে পারি যা ঋণাত্মক ভর (negative mass) ধারণ করে, তাহলে হয়তো ওয়ার্মহোলকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়াও, CERN-এর মতো বড় বড় গবেষণা কেন্দ্রে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম কণাদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন, এই কণাগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত এবং মহাবিশ্বের গঠন কেমন। এই গবেষণার মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে সময়ের চাবিকাঠি।
আজকের আমি, ভবিষ্যতের আমি
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো “ব্যাক টু দ্য ফিউচার” বা “ইন্টারস্টেলার”-এর মতো সিনেমাতেই সময় পরিভ্রমণ দেখতে পাই। কিন্তু কে জানে, হয়তো আমাদের আজকের এই বিজ্ঞানীরাই একদিন সেই স্বপ্নকে সত্যি করে তুলবেন। হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য সময় পরিভ্রমণ কোনো কল্পবিজ্ঞানের বিষয় থাকবে না, বরং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াবে।
যদি সত্যিই আমরা অতীতে যেতে পারি, তবে ভেবে দেখুন, আমাদের শেখার পরিধি কতখানি বাড়বে! ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, হয়ে উঠবে জীবন্ত। আমরা হয়তো ভুলগুলো থেকে আরও ভালোভাবে শিখতে পারব এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারব।
আজকের এই আলোচনা হয়তো আপনাকে এক নতুন স্বপ্নের জগতে নিয়ে গেছে। বিজ্ঞান যেমন আমাদের অজানাকে জানতে উৎসাহিত করে, তেমনি অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্নও দেখায়। আর এই স্বপ্নগুলোই আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। কে জানে, হয়তো একদিন আপনার নাতি-নাতনিরাই আপনাকে বলবে, “দাদু/দিদা, তুমি তো সেই সময়টার গল্প বলছিলে যখন মানুষ সময় নিয়ে এত ভাবত!”
