অদৃশ্য ভিখারি ও এক মুঠো রোদ
আজ ১০ জুলাই, ২০২৬। ঢাকার এক কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। পাশ দিয়ে কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, কত গাড়ি ছুটছে। এদের মধ্যে কতজনের পকেটে আজ রাতের খাবারের টাকা আছে, কতজনের মাথায় ছাদ আছে, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? নাকি আমরা কেবল নিজেদের জগত নিয়েই ব্যস্ত? এই ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা প্রায়ই কিছু মানুষকে দেখতে পাই না, যারা আমাদের পাশেই বাস করে। তারা হয়তো পথে বসে আছে, কিংবা কোনো ফুটপাতের কোণে গুটিসুটি মেরে। তাদের হাতে ধরা থালা, চোখে একরাশ শূন্যতা। কিন্তু আজ আমি তাদের কথা বলতে আসিনি, যারা চোখে পড়ে। আমি বলতে এসেছি সেই সব ‘অদৃশ্য ভিখারিদের’ কথা, যারা আমাদের চারপাশেই আছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাই না।
আমাদের চারপাশের ‘অদৃশ্য’ মানুষগুলো
ভাবছেন, ‘অদৃশ্য ভিখারি’ আবার কী? এটা কি কোনো জাদুর গল্প? না, একেবারেই না। অদৃশ্য ভিখারি মানে সেই সব মানুষ, যাদের আমরা হয়তো ‘ভিখারি’ হিসেবে চিহ্নিত করি না, কিন্তু তারা আসলে অভাবের কাছে হার মেনেছে। এরা হতে পারে আপনার পাশের বাসার সেই একাকী বৃদ্ধা, যিনি নিজের জমানো টাকা দিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন, কিন্তু কারো কাছে হাত পাততে লজ্জা পান। হতে পারে সেই তরুণ, যে চাকরি হারিয়েছে, কিন্তু বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দিতে পারছে না। অথবা সেই মা, যে নিজের না খেয়ে সন্তানকে দুটো খাবার জোগাড় করে দিচ্ছে। এরা হয়তো ধুলোমাখা পোশাকে নেই, হাতে থালা নেই, কিন্তু তাদের প্রয়োজনগুলো বড় বেশি বাস্তব।
একবার ভাবুন তো, আমাদের সমাজে এমন কত মানুষ আছেন যারা দিনরাত পরিশ্রম করেও দু’মুঠো ডাল-ভাতের সংস্থান করতে পারেন না। তাদের শরীর হয়তো পোক্ত, কিন্তু ভাগ্যের মারপ্যাঁচে তারা সব হারিয়েছেন। তারা চায় না কারো কাছে ভিক্ষা করতে, তারা চায় শুধু একটু সুযোগ, একটু সম্মান। কিন্তু সেই সুযোগ বা সম্মান কি আমরা তাদের দিচ্ছি? আমরা যখন দামি রেস্তোরাঁয় বসে গলা ভেজাই, বা নতুন মডেলের ফোন হাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকি, তখন কি একবারও মনে পড়ে আমাদের সেই প্রতিবেশী মানুষটির কথা, যে হয়তো আজ সারাদিন কিছু খায়নি?
এক মুঠো রোদের স্বপ্ন
কিন্তু এই ‘অদৃশ্য ভিখারি’দের নিয়ে যখন মন ভারাক্রান্ত হয়, তখন মনে আসে এক টুকরো আশার আলো। সেটা হলো ‘এক মুঠো রোদ’। এই রোদ শুধু সূর্যের আলো নয়, এটা হলো মানুষের ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সাহায্যের প্রতীক। এই রোদ সেই সব মানুষের জন্য, যারা অন্ধকারে ডুবে আছে, যারা নিজেদের অসহায়ত্বের মধ্যে থেকেও একটুখানি উষ্ণতার খোঁজে থাকে।
যেমন, ধরুন, আমাদের পাড়ার রিকশাচালক করিম চাচা। বয়স ষাটের কাছাকাছি। রোজ সকালে রোদ ওঠার আগেই তার রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু তার রোজগার যা, তাতে নিজের আর নাতনিটার পেটই কোনোমতে ভরে। একদিন শীতের সন্ধ্যায় তার হাতে কোনো কাজ ছিল না। বাড়ি ফিরতে মন চাইছিল না। এমন সময় পাড়ার এক চা দোকানদার, যিনি নিজেও খুব স্বচ্ছল নন, তাকে ডেকে এক কাপ চা আর কিছু বিস্কুট দিলেন। করিম চাচার কাছে সেই এক কাপ চা আর বিস্কুট যেন এক মুঠো রোদ ছিল। ওইটুকু উষ্ণতা তাকে সারারাত ভালো থাকতে সাহায্য করেছিল।
এটা শুধু করিম চাচার গল্প নয়। আমাদের চারপাশে এমন হাজারো গল্প লুকিয়ে আছে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কোনো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষার ভার নেন, বা কোনো শিল্পী নিজের উপার্জনের একটা অংশ কোনো আশ্রয়হীন কেন্দ্রে দান করেন, তখন তারা আসলে সেই ‘অদৃশ্য ভিখারিদের’ জীবনে এক মুঠো রোদ ছড়িয়ে দেন।
বদলে দেওয়া এক চিলতে হাসি
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার সামান্য একটু সহানুভূতি বা সাহায্য কারো জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে? হতে পারে সেটা একটি ছোট্ট অভ্যাস, যা আপনি প্রতিদিন চর্চা করতে পারেন।
যেমন:
- একটু বাড়তি খাবার ভাগ করে নেওয়া: আপনি হয়তো আজ একটু বেশি রান্না করেছেন। সেই অতিরিক্ত খাবারটা যদি আপনার পাশের কোনো অভাবী প্রতিবেশীর সাথে ভাগ করে নেন, তবে তা তার কাছে অমূল্য হয়ে উঠতে পারে।
- পুরোনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য জিনিস দান করা: আপনার আলমারিতে হয়তো এমন অনেক কাপড়চোপড় বা জিনিস আছে যা আপনার আর প্রয়োজন নেই, কিন্তু অন্যের জন্য তা নতুন জীবনের সূচনা করতে পারে।
- কারো কথা মন দিয়ে শোনা: অনেক সময় মানুষ শুধু চায় কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনুক। আপনার সহকর্মী, বন্ধু বা পরিবারের কেউ যদি কোনো সমস্যায় থাকে, তবে তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তার কথা শুনলেই হয়তো তার মন হালকা হয়ে যায়।
- ছোট্ট একটি প্রশংসা: কেউ হয়তো কোনো ভালো কাজ করেছে, বা তার দিনটা ভালো যায়নি। আপনার একটি আন্তরিক প্রশংসা, “আপনার কাজটা খুব সুন্দর হয়েছে” বা “আজ আপনাকে খুব খুশি লাগছে” – এগুলোও কারো জীবনে আলো নিয়ে আসতে পারে।
আমি নিজে এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। একবার এক বাসে এক বয়স্ক মহিলাকে দেখলাম বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পাশে এক তরুণ ছেলে, যে হয়তো আমার চেয়ে অনেক কম মাইনে পায়, সে নিজের সিটটি ছেড়ে দিল মহিলাটির জন্য। ওই বয়স্ক মহিলাটির মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠেছিল, সেটা আমি আজও ভুলতে পারি না। ওই তরুণটির কাছে হয়তো সিট ছেড়ে দেওয়াটা বড় কিছু ছিল না, কিন্তু ওই বয়স্ক মহিলার কাছে তা ছিল এক অমূল্য দান, এক মুঠো রোদ।
আমাদের দায়িত্ব কোথায়?
আমরা প্রায়শই বলি, “সরকারের উচিত…”, “সমাজের উচিত…”। কিন্তু এই ‘সরকার’ বা ‘সমাজ’ আসলে কারা? আমরা নিজেরা! তাই দায়িত্বটা আসলে আমাদের সবার। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে একটুখানি এগিয়ে আসি, তাহলে হয়তো সেই ‘অদৃশ্য ভিখারিদের’ আর অদৃশ্য থাকতে হবে না। তারা আমাদের সমাজের মূল স্রোতে মিশে যেতে পারবে।
আজকের এই প্রযুক্তি নির্ভর পৃথিবীতে, যেখানে তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে আমরা কেন আরও বেশি সহানুভূতিশীল হতে পারি না? আমরা কেন পারি না অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে? আমাদের মনে রাখা উচিত, আমরা সবাই একই আকাশের নিচে বাস করি, একই মাটির ওপর চলি। তাই আমাদের একে অপরের প্রতি সহমর্মী হওয়াটা খুব জরুরি।
জাগিয়ে তুলুন ভেতরের আলো
আসুন, আজ থেকে আমরা নিজেদের চারপাশের ‘অদৃশ্য ভিখারিদের’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। তারা হয়তো আমাদের প্রতিদিনের ভিড়ে হারিয়ে যায়, কিন্তু তাদেরও প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান আর একটুখানি আশ্রয়। আর যখন আমরা তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তখন আমরা কেবল তাদের জীবনেই নয়, নিজেদের জীবনেও এক নতুন আলো নিয়ে আসি। সেই আলোয় আলোকিত হোক আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ।
মনে রাখবেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই একটি সূর্য লুকানো থাকে, শুধু প্রয়োজন তাকে জাগিয়ে তোলার। আসুন, সেই আলো ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে।
