“`html
মহাকাশের অলিগলি: মানুষের অজানা বিস্ময়
যদি বলি, আপনি এই মুহূর্তে যে চেয়ারে বসে আছেন, তার থেকেও অনেক বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে এমন কিছু, যা আমরা প্রায় কিছুই জানি না? চমকে উঠলেন? কিন্তু এটাই সত্যি। আমাদের চারপাশের মহাবিশ্ব, যা আমরা রাতের আকাশে তারাদের ঝিকিমিকি দেখে অনুমান করার চেষ্টা করি, তা আসলে এক বিশাল, অসীম রহস্যের ভান্ডার। এই ভান্ডার এত বড় যে, মানুষের আবিষ্কৃত সবকিছু তার তুলনায় এক চিমটি বালির মতো। আজ আমরা সেই অলিগলিতেই ডুব দেব, যেখানে লুকিয়ে আছে মানুষের কল্পনারও অতীত সব বিস্ময়।
আলোর চেয়ে দ্রুত ছোটে যে চিন্তা, সেখানে কী লুকিয়ে?
ভাবুন তো, আপনি একটি লাইট বাল্ব জ্বালালেন। সেই আলো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু মহাকাশে আলোর গতিও (প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড) অনেক সময় কম মনে হয়। কেন? কারণ মহাকাশ এত সুবিশাল! আমাদের সৌরজগতের একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেও আলোকরশ্মিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। আর মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি? সেখানে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে প্রায় ১ লক্ষ বছর! ভাবা যায়? এই বিশালতার মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে যা হয়তো আমাদের আলোর গতিকেও হার মানিয়ে দেবে, বা হয়তো এমন কোনো ফিজিক্সের নিয়ম কাজ করে যা আমরা এখনো আবিষ্কারই করতে পারিনি।
যেমন ধরুন, “ডার্ক ম্যাটার” বা “অদৃশ্য পদার্থ”। আমরা যা দেখতে পাই, যে গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি — এই সবকিছুর মোট ভর মহাবিশ্বের মোট ভরের মাত্র ৫%। বাকি ৯৫% কী? এর মধ্যে প্রায় ২৭% হলো ডার্ক ম্যাটার এবং প্রায় ৬৮% হলো ডার্ক এনার্জি। এই ডার্ক ম্যাটার কী, তা আমরা জানি না। কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব আমরা বুঝতে পারি। গ্যালাক্সিগুলো যেভাবে ঘুরছে, যেভাবে গ্যালাক্সিপুঞ্জ তৈরি হয়েছে, তার জন্য এই অদৃশ্য পদার্থের উপস্থিতি জরুরি। অনেকটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো, যাদের আমরা দেখতে পাই না কিন্তু তাদের নড়াচড়া বুঝতে পারি।
মহাকাশে কি ভেসে বেড়ায় জলজমিন?
আমরা যখন পৃথিবীর বাইরে জীবনের খোঁজ করি, তখন প্রথমেই পানির কথা ভাবি। কারণ আমাদের জানা মতে, জীবন ধারণের জন্য পানির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মহাকাশে শুধু বরফ বা বাষ্প নয়, অনেক জায়গায় তরল পানির বিশাল ভান্ডার থাকার সম্ভাবনা প্রবল। বৃহস্পতির চাঁদ ‘ইউরোপা’ বা শনির চাঁদ ‘এনসেলাডাস’-এর বরফের নিচে সুবিশাল মহাসাগর থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই মহাসাগরগুলোতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ভাবুন তো, পৃথিবীর বাইরে, কোটি কোটি মাইল দূরে, বরফের চাদরে ঢাকা কোনো চাঁদের গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানেও প্রাণের স্পন্দন! এটা কি রোমাঞ্চকর নয়?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের মহাসাগরগুলোতে ‘হাইড্রothermal ভেন্ট’ থাকতে পারে, যেমনটা পৃথিবীর সমুদ্রের তলদেশেও দেখা যায়। সেখানে আলো ছাড়াই রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং এক ধরনের জীবন টিকে থাকে। ইউরোপা বা এনসেলাডাসের ক্ষেত্রেও একই রকম প্রাণের উদ্ভব হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যদি এমনটা সত্যিই হয়, তবে তা মহাবিশ্বে আমাদের একাকীত্বের ধারণাকেই বদলে দেবে।
গ্যালাক্সির গভীরে লুকানো রহস্যময় দানব
মহাকাশের গল্পে ‘ব্ল্যাক হোল’ বা কৃষ্ণগহ্বর এক অতি পরিচিত অথচ ভীতিপ্রদ চরিত্র। কিন্তু এই ব্ল্যাক হোলগুলোর ভেতরে কী আছে, তা আমরা এখনো জানি না। শুধু জানি, এদের মহাকর্ষীয় টান এতটাই প্রবল যে আলোও সেখান থেকে বের হতে পারে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ‘সিঙ্গুলারিটি’, যেখানে স্থান-কাল (spacetime) অসীম ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু এই সিঙ্গুলারিটিতে আসলে কী ঘটে, তা আমাদের বর্তমান পদার্থবিদ্যার জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি, বিজ্ঞানীরা ‘ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ’ (Event Horizon Telescope) ব্যবহার করে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যা আমাদের অনেক নতুন তথ্য দিয়েছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার নাম ‘স্যাজিটেরিয়াস এ*’ (Sagittarius A*)। এই ব্ল্যাক হোলগুলো কেবলই মহাকাশের দানব নয়, এরা গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদের চারপাশের বিশাল গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ থেকে এরা খাবার গ্রহণ করে, যা মহাকাশে এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা করে।
নতুন তারা জন্ম নিচ্ছে যেখানে
মহাকাশ কেবল শূন্যতা নয়, এটি সৃষ্টি এবং ধ্বংসের এক অনন্ত লীলাক্ষেত্র। নক্ষত্রেরা জন্ম নেয় সুবিশাল গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ থেকে, যাদের বলা হয় ‘নেবুলা’। এই নেবুলাগুলো এত বড় হয় যে, তাদের মধ্যে হাজার হাজার সৌরজগত তৈরি হতে পারে। আমাদের সৌরজগতের জন্মও হয়েছিল প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে এমনই একটি মেঘ থেকে।
যেমন, ‘ঈগল নেবুলা’-র (Eagle Nebula) বিখ্যাত ‘পিলার্স অফ ক্রিয়েশন’ (Pillars of Creation) ছবিটি দেখুন। সেখানে ধূলিকণা ও গ্যাসের স্তম্ভের মধ্যে নতুন নতুন তারা জন্ম নিচ্ছে। এই দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক শিল্পকর্ম। প্রতিটি নতুন তারা আমাদের মহাবিশ্বের গল্পে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করে। আর যখন কোনো বিশাল নক্ষত্র তার জীবনচক্র শেষ করে, তখন সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সে মহাকাশে ছড়িয়ে দেয় নানা ভারী মৌল, যা পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরিতে কাজে লাগে। আমরা সবাই আসলে সেই নক্ষত্রদেরই সন্তান!
দূরবর্তী জগতের অদ্ভুতresident
মহাবিশ্ব এতটাই বিশাল যে, এখানে আমাদের পৃথিবীর মতো গ্রহের সংখ্যা গণনা করাও কঠিন। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত হাজার হাজার ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ (exoplanet) বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ আবিষ্কার করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই তাদের নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জোন’-এ (habitable zone) অবস্থান করছে, যেখানে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিছু এক্সোপ্ল্যানেটের বৈশিষ্ট্য তো আমাদের সাধারণ ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে। যেমন, ‘ওসান প্ল্যানেট’ (ocean planet) যেখানে পুরো গ্রহটিই পানিতে ঢাকা। আবার আছে ‘সুপার-আর্থ’ (super-Earth), যা আমাদের পৃথিবীর চেয়ে আকারে বড়। আবার কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল এত ঘন যে, সেখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি। আবার কিছু গ্রহ রয়েছে যাদের দুটি সূর্য রয়েছে, যেখানে দিন ও রাত এক অদ্ভুত খেলায় মেতে থাকে। কল্পনার সব রং যেন এখানে এসে মিশেছে।
যেমন, ‘ট্রাপিস্ট-১’ (TRAPPIST-1) সিস্টেমের কথা ধরুন। এখানে সাতটি পাথুরে গ্রহ রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি গ্রহ তাদের নক্ষত্রের হ্যাবিটেবল জোনে রয়েছে। এই গ্রহগুলোর কোনোটিতে কি প্রাণের বিকাশ সম্ভব? এই প্রশ্ন আমাদের ভাবায়, আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
গ্রহাণু ও ধূমকেতুর অন্তহীন যাত্রা
মহাকাশের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় আরও কিছু রহস্যময় বস্তু – গ্রহাণু (asteroid) এবং ধূমকেতু (comet)। এরা আসলে সৌরজগতের আদি উপাদান, যা গ্রহ তৈরির সময় ব্যবহৃত হয়নি। এরা মহাকাশে ভেসে বেড়ায়, কখনো কখনো গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষের হুমকিও তৈরি করে। কিন্তু এরা কেবলই ভয় বা ধ্বংসের প্রতীক নয়, এরা মহাকাশের ইতিহাস বহন করে।
যেমন, ধূমকেতুগুলো বরফ ও ধূলিকণার তৈরি গোলক। যখন এরা সূর্যের কাছাকাছি আসে, তখন এদের বরফ গলে গিয়ে এক বিশাল লেজ তৈরি হয়, যা রাতের আকাশে এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর অনেক পানি হয়তো এই ধূমকেতুগুলোর মাধ্যমেই এসেছে। এছাড়াও, এরা সৌরজগতের গঠন সম্পর্কে অমূল্য তথ্য বহন করে।
মহাকাশ স্টেশন ‘রোজেটা’ (Rosetta) একটি ধূমকেতুতে অবতরণ করে সেখানে গবেষণা চালিয়েছিল, যা আমাদের এই মহাজাগতিক বস্তুদের সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য দিয়েছে। এই ছোট ছোট বস্তুগুলোও মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়।
মহাকাশের এই অনন্ত বিস্তার, এই অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়গুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা কত ক্ষুদ্র, অথচ এই ক্ষুদ্রতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসীম সম্ভাবনা। নতুন কিছু জানার, নতুন কিছু আবিষ্কার করার যে আকাঙ্ক্ষা, তা মানুষকে চিরকালই মহাকাশের দিকে আকৃষ্ট করেছে। আর এই যাত্রা কেবল শুরু। কে জানে, আগামী দিনে আমরা আর কী কী বিস্ময়ের মুখোমুখি হব!
“`
