Stacked stones in a peaceful outdoor setting symbolize balance and mindfulness.

ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া ‘ব্যক্তিগত সময়’: কীভাবে বাঁচবেন?

লাইফস্টাইল






প্রথম আলো ম্যাগাজিন – ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া ‘ব্যক্তিগত সময়’: কীভাবে বাঁচবেন?


ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া ‘ব্যক্তিগত সময়’: কীভাবে বাঁচবেন?

গত এক সপ্তাহে আপনি কত ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ রেখেছেন? উত্তরটা কি আপনাকে ভাবাচ্ছে? আজকের পৃথিবীতে, আমরা সবাই যেন এক অদৃশ্য জালে বন্দী – ডিজিটাল দুনিয়ার। এই জালের টান বড়ই প্রবল, এতটাই যে নিজের সঙ্গে একটু নিরিবিলি সময় কাটানো এখন বিলাসিতা মনে হয়।

ভাবুন তো, আপনার দাদু-দিদিমার সময়টা কেমন ছিল? দিনের বেশিরভাগ সময় কাটত প্রকৃতির সান্নিধ্যে, বই পড়ে, মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি গল্প করে। অথবা আপনার বাবা-মায়ের ছোটবেলার কথা ভাবুন। তখন হয়তো টেলিভিশন ছিল, কিন্তু আজকের মতো স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, আর সোশ্যাল মিডিয়ার হাজারো হাতছানি ছিল না। জীবনটা ছিল অনেক ধীর, অনেক শান্ত। এখন? সকাল শুরু হয় অ্যালার্মের বদলে নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দে, আর রাত শেষ হয় স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে। আমাদের ব্যক্তিগত সময় যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে এই ডিজিটাল রাক্ষস।

“নোটিফিকেশন” নামের বিভীষিকা: কখন থামবেন?

আপনার স্মার্টফোনটা কি আপনার মনিব হয়ে উঠেছে? ঘুম ভাঙার সাথে সাথে ইমেইল চেক করা, কাজের ফাঁকে ফাঁকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপে উঁকি মারা – এই কি আপনার রোজনামচা? আমরা অনেকেই অজান্তেই এই অভ্যাসের দাস হয়ে গেছি। প্রতিটি নোটিফিকেশন যেন এক ছোট্ট হাতছানি, যা আমাদের মূল কাজ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই ছোট্ট ছোট্ট বিরতিগুলো জমা হতে হতে দিনের বড় একটা অংশ চলে যায়। ভাবুন তো, আপনি হয়তো কোনো জরুরি কাজ করছেন, হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন এলো – “আপনার বন্ধু লাইক করেছে আপনার নতুন পোস্ট”। এই একটা লাইকের জন্য আপনার মনোযোগটা চলে গেল, এবং সেই হারানো মনোযোগ ফিরে পেতে কয়েক মিনিট লেগে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একবার মনোযোগ বিঘ্নিত হলে তা আবার আগের জায়গায় ফিরতে প্রায় ২৩ মিনিট সময় লাগে!

একটু হিসেব করে দেখুন তো, দিনে কতবার আপনার ফোন বেজে ওঠে বা ভাইব্রেশন হয়? আর প্রতিবারই কি আপনি ফোনটা তোলেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে বুঝতে হবে আপনি ‘নোটিফিকেশন’ নামের এই ডিজিটাল বিভীষিকার শিকার।

সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধা: নিজেকে হারানো নাকি খুঁজে পাওয়া?

সোশ্যাল মিডিয়া নিঃসন্দেহে যোগাযোগ আর তথ্যের আদান-প্রদানের এক দারুণ মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমেই আমরা সবচেয়ে বেশি নিজেদের হারিয়ে ফেলি। অন্যের সাজানো গোছানো জীবন দেখে আমরা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করি। “অমুক হানিমুনে গেছে”, “তমুক নতুন গাড়ি কিনেছে”, “অমুক বিদেশে ঘুরতে গেছে” – এইসব দেখে আমাদের মনে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি হয়। আমরা ভুলে যাই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখি, তার অনেক কিছুই আসলে বাস্তবতার এক রঞ্জিত ছবি মাত্র।

মনে আছে, ছোটবেলায় আমরা মাঠেঘাটে খেলে বেড়াতাম? তখন আমাদের সময় কাটত নিজেদের মধ্যে গল্প করে, ছোটখাটো ঝগড়া করে, আবার মিলেও গিয়ে। সেই সময়টা ছিল খাঁটি, যেখানে কোনো ফিল্টার ছিল না, ছিল না কোনো লাইক-কমেন্টের প্রতিযোগিতা। এখন সেই খেলার মাঠটা হয়ে গেছে ভার্চুয়াল। আমরা হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’ তৈরি করি, কিন্তু মনের কথা বলার মতো দু-একজন বন্ধু খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ: রিতা, একজন তরুণ গ্রাফিক ডিজাইনার, প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর সময় ব্যয় করত। অন্যের আঁকা ছবি দেখে, তাদের লাইক-কমেন্ট দেখে সে নিজের কাজ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ত। তার মনে হত, সে কিছুই পারে না। কিন্তু যখন সে তার ফোনের স্ক্রিন টাইম ট্র্যাক করা শুরু করল, তখন সে অবাক হয়ে গেল – দিনে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা সে এই কাজেই ব্যয় করছে! এরপর সে সিদ্ধান্ত নিল, সে প্রতিদিন এক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে এবং বাকি সময়টা নিজের পোর্টফোলিও তৈরিতে ব্যয় করবে। কয়েক মাসের মধ্যেই সে অনেক উন্নতি করল এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল।

‘ফ্লিপিং আউট’ বনাম ‘ডিজিটাল ডিটক্স’: কখন আপনার মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেবেন?

আমরা প্রায়ই বলি, “আজ সারাদিন নেট ঘেঁটে মাথাটা ফ্লিপ করে গেল!” এই ‘ফ্লিপিং আউট’ হওয়াটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কের অতিরিক্ত ডিজিটাল ইনপুট নেওয়ার ফল। মস্তিষ্কও তো বিশ্রাম চায়, তাই না? কিন্তু আমরা তাকে বিরতি দিই না। আমরা যখন একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন আমাদের চোখের উপর চাপ পড়ে, মনোযোগ কমে যায়, আর মানসিক ক্লান্তি বাড়ে।

এই ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় – ডিজিটাল ডিটক্স। এর মানে এই নয় যে আপনাকে ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। এর মানে হল, প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় বা সপ্তাহের কিছু দিন ঠিক করুন যখন আপনি কোনো স্ক্রিন ব্যবহার করবেন না। এই সময়টা হতে পারে পরিবারের সাথে গল্প করার জন্য, বই পড়ার জন্য, পছন্দের গান শোনার জন্য, বা শুধু চুপচাপ বসে থাকার জন্য।

ডিজিটাল ডিটক্সের কিছু সহজ উপায়:

  • নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন: যেসব অ্যাপের নোটিফিকেশন আপনার প্রয়োজন নেই, সেগুলো বন্ধ করে দিন।
  • নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করুন: সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করুন।
  • ‘নো-ফোন জোন’ তৈরি করুন: যেমন – খাবার টেবিল বা বেডরুমকে ‘নো-ফোন জোন’ হিসেবে ঘোষণা করুন।
  • অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ডিলিট করুন: যে অ্যাপগুলো আপনি খুব কম ব্যবহার করেন বা আপনার সময় নষ্ট করে, সেগুলো ডিলিট করে দিন।
  • প্রকৃতির সান্নিধ্য খুঁজুন: দিনের কিছু সময় বাইরে কাটান, হাঁটুন, গাছের সবুজ দেখুন।

ব্যক্তিগত সময়কে ‘নিজের’ করে নেওয়া: একটু চেষ্টা, অনেক শান্তি

ব্যক্তিগত সময় মানে শুধু একা থাকা নয়, বরং নিজেকে সময় দেওয়া। এই সময়টা নিজের প্রয়োজনগুলোকে বোঝা, নিজের শখগুলোকে চর্চা করা, নিজের ভেতরের মানুষটার সাথে সংযোগ স্থাপন করা। ডিজিটাল দুনিয়ার এই তীব্র স্রোতে ভেসে না গিয়ে, নিজের জন্য একটুখানি শান্ত ও নির্জন দ্বীপ তৈরি করতে পারাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আপনার দাদু-দিদিমার গল্পগুলো কি মনে পড়ে? তারা হয়তো প্রতিদিন কিছু সময় ধরে রাখতেন শুধু নিজেদের জন্য – কেউ হয়তো চুপচাপ বসে চা খেতেন, কেউ বাগানে গাছের যত্ন নিতেন, কেউ বা শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবতেন। সেই সময়গুলোই তাদের জীবনকে একটা গভীরতা দিয়েছিল।

আমরাও পারি। আমাদেরকেও নিজের জন্য সেই সময়টুকু বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এটা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য। ভাবুন তো, সেই সময়টা যখন আপনি কোনো ফোন, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না, বরং নিজের ভালো লাগার কোনো কাজ করছেন, বা নিছকই নিজের মনের কথা শুনছেন – সেই অনুভূতিটা কতটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে!

“ডিজিটাল দুনিয়ার কোলাহল থেকে বেরিয়ে এসে, নিজের ভেতরের নীরবতাকে শুনতে শিখুন। সেখানেই খুঁজে পাবেন হারানো ব্যক্তিগত সময়ের সন্ধান।”

আসুন, আজ থেকেই শুরু করি। ছোট্ট একটি পদক্ষেপ, যা আমাদের জীবনকে ফিরিয়ে দিতে পারে এক নতুন ছন্দ, এক নতুন আলো। ডিজিটাল সময়ের এই স্রোতে আমরা যেন ভেসে না যাই, বরং নিজেদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নিজেদের জন্য বাঁচতে শিখি।


মন্তব্য করুন