আলোর রেখা। নামটা যেমন সুন্দর, মানুষটাও তেমনই। কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, নাম তার শিমুলতলী। সেই গ্রামেরই মেয়ে আলো। বাবা দিনমজুর, মা পরের বাড়িতে কাজ করেন। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আলো, তার নামের মতোই, জীবনে অন্ধকারকে হার মানাতে চেয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল ভীষণ মেধাবী। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার মতো ভালো ছাত্র আর ছিল না। কিন্তু অভাবের কারণে তার পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। অষ্টম শ্রেণির পর তাকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়।
আলোর স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। সে ডাক্তার হতে চেয়েছিল। গ্রামের মানুষের সেবা করবে, তাদের কষ্ট দূর করবে। কিন্তু স্বপ্নটা যেন এক অলীক কল্পনা। তার বাবা-মা তাকে বোঝাতেন, ‘বাছা, আমাদের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তোর বিয়ে দিয়ে দিলেই আমরা বাঁচি।’ আলো চুপ করে শুনত। তার বুকের ভেতরটা হু হু করত। কিন্তু সে হার মানার পাত্রী ছিল না।
পাশের গ্রামের এক ছেলে, নাম তার রতন। সেও একই স্কুলে পড়ত। রতন ছিল আলোগুলো থেকে এক বছরের বড়। আলোগুলোকে তার ভালো লাগত। আলোগুলোর মেধা আর বুদ্ধির তারিফ করত সে। আলোগুলোর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর শুনে রতন খুব কষ্ট পেয়েছিল। একদিন সে আলোগুলোর বাড়িতে গেল। আলোগুলোর বাবাকে বলল, ‘আপনার মেয়েটা খুব ভালো। ওকে পড়তে দিন। আমি ওকে সব সাহায্য করব।’ আলোগুলোর বাবা রাজি হলেন না।
কিন্তু রতন হাল ছাড়ল না। সে আলোগুলোর বাবাকে বোঝাতে লাগল। আলোগুলোর মা-ও আলোগুলোর জন্য খুব কষ্ট পেতেন। তিনি রতনকে বললেন, ‘আমার মেয়েটা খুব পড়তে চায়। কিন্তু আমাদের যে কিছু নেই।’ রতন বলল, ‘আপনারা শুধু ওকে পড়তে দেবেন। বাকিটা আমি দেখছি।’ আলোগুলোর বাবা রাজি হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন, আলোগুলোকে বাড়ির সব কাজ করতে হবে।
আলোগুলো তখন থেকে দিনরাত এক করে ফেলল। সকালে বাড়ির সব কাজ সেরে, তারপর সেলাই মেশিনে জামাকাপড় সেলাই করত। সেই টাকা দিয়ে বই কিনত। রাতে হারিকেনের আলোয় পড়ত। রতন তাকে সব বিষয়ে সাহায্য করত। সে আলোগুলোর জন্য গল্পের বই আনত, পুরনো খবরের কাগজ আনত। আলোগুলো সব মন দিয়ে পড়ত।
এভাবেই দিন কাটছিল। আলোগুলোর বয়স যখন সতেরো, তখন তার বিয়ে ঠিক হল। ছেলেটি পাশের গ্রামের। সে নাকি শহরে কাজ করে। আলোগুলো আবার ভেঙে পড়ল। তার সব স্বপ্ন আবার ফিকে হয়ে গেল। রতন জানতে পেরে খুব কষ্ট পেল। সে আলোগুলোর বাড়িতে গেল। আলোগুলোর বাবাকে বলল, ‘আপনি কি আলোগুলোর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেবেন? ওকে পড়তে দিন। আমি ওকে শহরে নিয়ে যাব। সেখানে ওর ভালো একটা ব্যবস্থা করে দেব।’
আলোগুলোর বাবা প্রথমে রাজি হলেন না। কিন্তু আলোগুলোর মা আলোগুলোর পাশে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, ‘আমার মেয়েটা পড়তে চায়। ওকে ওর স্বপ্ন পূরণ করতে দাও।’ অনেক বোঝানোর পর আলোগুলোর বাবা রাজি হলেন। রতন আলোগুলোকে নিয়ে শহরে এল।
শহরে এসে আলোগুলো এক স্কুলে ভর্তি হল। কিন্তু সেখানে পড়াশোনার খরচ অনেক। রতন নিজের জমানো টাকা আর কিছু ধার করে আলোগুলোর পড়াশোনার ব্যবস্থা করল। আলোগুলো দিনরাত এক করে পড়াশোনা করতে লাগল। সেলাই করে, টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত। রতনও তাকে সবসময় উৎসাহ দিত।
কয়েক বছর পর আলোগুলো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হল। রতন তখন তার সব জমানো টাকা আলোগুলোর জন্য খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু সে আলোগুলোর স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে চায়নি। আলোগুলো যখন ডাক্তারি পাশ করল, তখন রতন আলোগুলোর কাছে গেল। আলোগুলো তখন এক বড় হাসপাতালে ডাক্তার। আলোগুলো রতনকে দেখে খুব খুশি হল। সে রতনকে বলল, ‘তোমার জন্যই আজ আমি ডাক্তার হতে পেরেছি। তুমি না থাকলে আমার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত।’
রতন আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসল। আলোগুলোর চোখে জল। সে বলল, ‘আমি তোমার স্বপ্নপূরণের সঙ্গী হতে পেরেছি, এর চেয়ে বড় আর কী আছে?’ আলোগুলো রতনকে বিয়ে করল। তারা একসাথে গ্রামে ফিরে এল। আলোগুলো নিজের গ্রামে একটি হাসপাতাল তৈরি করল। গ্রামের মানুষের সেবা করতে লাগল। রতন তাকে সব কাজে সাহায্য করত। তাদের ভালোবাসার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল পুরো শিমুলতলী গ্রাম। অভাবের মাঝেও যে স্বপ্ন দেখা যায়, আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা মানুষকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, আলোগুলোর জীবন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

