Happy group of children in a Zambian schoolyard on a sunny day.

রতনপুর গ্রামের নতুন পাঠশালা

গল্পের আসর

রতনপুর গ্রামের নতুন পাঠশালা

রতনপুর গ্রামটা ছিল একেবারে অন্যরকম। সবুজ ধানের ক্ষেত, আম জামের বাগান, আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদী – সব মিলিয়ে ছবির মতো সুন্দর। কিন্তু গ্রামের মানুষগুলোর মনে ছিল বিষাদের ছায়া। কেন জানেন? কারণ, রতনপুরে কোনো স্কুল ছিল না। গ্রামের ছেলেমেয়েরা বড় হয়েও অক্ষরজ্ঞান পেত না। কেউ যেত পাশের গ্রামে হেঁটে, কেউবা আবার পড়াশোনা করাই বাদ দিত।

গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ, রহিম চাচা, প্রায়ই আফসোস করতেন। বলতেন, ‘আমাদের সময়ে এমন হলে কত ভালো হতো!’ তাঁর নাতি, ছোট্ট রতন, বাবার মুখে এই কথা শুনে মন খারাপ করত। রতন ছিল খুব চঞ্চল আর কৌতুহলী। সে প্রায়ই নদীর ধারে বসে ভাবত, ‘আচ্ছা, বইয়ের ভেতরের জগৎটা কেমন?’

একদিন, পাশের বড় শহর থেকে একজন ভদ্রলোক এলেন রতনপুরে। তাঁর নাম ছিল আনিস সাহেব। তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবক। গ্রামের এই অবস্থা দেখে তাঁর খুব মায়া হলো। তিনি গ্রামের মোড়লদের সাথে কথা বললেন। বললেন, ‘আমি চাই রতনপুর গ্রামে একটি স্কুল তৈরি করতে। আপনারা কি সাহায্য করবেন?’

মোড়লরা প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিলেন। এত বড় কাজ, কীভাবে হবে? কিন্তু আনিস সাহেব তাদের বোঝালেন। বললেন, ‘আপনারা শুধু একটু জায়গা দিন, আর ছেলেমেয়েদের আসতে বলুন। বাকি সব আমি দেখব।’ গ্রামের মানুষেরা রাজি হলো। তারা গ্রামের এক কোণে একটি পুরনো, প্রায় পরিত্যক্ত ঘর ঠিক করল। গ্রামের যুবকেরা মিলে ঘরটি পরিষ্কার করল, রং করল। রহিম চাচার বাড়ির পাশে থাকা একটি বড় আমগাছের নিচে তৈরি হলো ছোট্ট একটি পাঠশালা।

আনিস সাহেব নিজের পকেট থেকে বই, খাতা, পেনসিল কিনে আনলেন। গ্রামের এক তরুণ, যে শহরে পড়াশোনা করত, তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়ে এলেন। রতন ছিল প্রথম ছাত্র। তার দেখাদেখি গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েরাও আসতে শুরু করল। প্রথমে সংখ্যায় কম থাকলেও, ধীরে ধীরে পাঠশালার পরিচিতি বাড়ল।

রতন খুব ভালো ছাত্র হলো। সে শুধু পড়তেই শিখল না, সুন্দর করে লিখতেও শিখল। তার দেখাদেখি অন্যরাও আগ্রহী হলো। পাঠশালাটা যেন গ্রামের প্রাণ হয়ে উঠল। ছেলেমেয়েরা শুধু পড়তেই শিখল না, তারা গান গাইতে, ছবি আঁকতেও শিখল। আনিস সাহেব মাঝে মাঝে শহরে থেকে এসে তাদের নতুন নতুন বই এনে দিতেন, তাদের সাথে গল্প করতেন।

একদিন, রতন তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, আমি বড় হয়ে এই পাঠশালাতেই শিক্ষক হতে চাই।’ তার বাবা আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। রহিম চাচা, যিনি একসময় আফসোস করতেন, এখন গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘দেখলে, আমার রতনপুর গ্রামের ছেলেমেয়েরাও এখন কত কিছু শিখছে!’

রতনপুর গ্রামের সেই ছোট্ট পাঠশালাটি শুধু অক্ষর জ্ঞানই দিল না, এটি গ্রামের মানুষের মনে আশা জাগাল। বুঝিয়ে দিল, সঠিক চেষ্টা আর একটুখানি সাহায্য পেলে যেকোনো গ্রামই হয়ে উঠতে পারে আলোকিত। রতনপুর গ্রাম এখন আর অবহেলিত নয়, এটি এখন শিক্ষার আলোয় ঝলমল করছে।

মন্তব্য করুন