Silhouetted palm trees against a vibrant tropical sunset with a couple on a romantic beach walk.

শেষ বিকেলের আলো

লাভ স্টোরি

আকাশে তখন শেষ বিকেলের আলো। সোনালী আভা ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত জুড়ে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে একা হেঁটে চলেছে অনন্যা। বয়স সবে পঁচিশ, কিন্তু জীবনের পথে কত অভিজ্ঞতার ঝুলি তার। বছর তিনেক আগে স্বামীহারা হওয়ার পর থেকে সে যেন এক অন্য মানুষ। গ্রামের সবাই তাকে সমীহ করে, কিন্তু তার একাকীত্ব কেউ বোঝে না।

হঠাৎ পথের ধারে এক বটগাছের নিচে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখে থমকে দাঁড়াল অনন্যা। লোকটির মুখ অচেনা। পরনে সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। অনন্যা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে? এখানে এভাবে বসে আছেন কেন?”

বৃদ্ধ স্মিত হেসে বললেন, “আমি সুশান্ত। এই গ্রামেই আমার জন্ম, যদিও অনেক বছর পর ফিরলাম। মনটা কেমন যেন টানছিল, তাই চলে এলাম।”

কথা বলে অনন্যা বুঝল, সুশান্ত বাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। তিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। স্ত্রী গত হয়েছেন অনেক বছর আগে। সন্তানরা বিদেশে থাকে। এই একাকী জীবনে তিনি নতুন করে গ্রামের শান্ত পরিবেশে শান্তি খুঁজে পেতে চেয়েছেন।

এরপর প্রায়ই দেখা হতে লাগল তাদের। অনন্যা সুশান্ত বাবুর কাছে যেত নানা গল্প শুনতে। অধ্যাপক তার জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান আর দর্শন দিয়ে অনন্যার মনকে ছুঁয়ে যেতেন। অনন্যাও তার সরলতা আর প্রাণবন্ততা দিয়ে সুশান্ত বাবুর একাকী জীবনে নতুনত্বের ছোঁয়া এনে দিত।

গ্রামের লোকেরা প্রথমে একটু আড়ালে হাসাহাসি করত। অসমবয়সী এই মেলামেশা তাদের কাছে স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু অনন্যা আর সুশান্ত বাবু এসবে কান দিত না। তারা একে অপরের মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মিক সংযোগ খুঁজে পেয়েছিল। অনন্যা সুশান্ত বাবুর মধ্যে পেয়েছিল একজন অভিভাবক, একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শক। আর সুশান্ত বাবু অনন্যার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন হারানো যৌবনের দীপ্তি, এক নতুন জীবনের আশা।

একদিন সন্ধ্যায়, নদীর ধারে বসে ছিল তারা। সূর্যাস্ত হচ্ছিল। লালচে আলোয় চারপাশটা মায়াবী লাগছিল। সুশান্ত বাবু অনন্যার হাত ধরে বললেন, “অনন্যা, আমি জানি আমাদের বয়সের ব্যবধান অনেক। কিন্তু মন তো বয়স মানে না। তুমি কি পারবে আমার এই শেষ বয়সে আমার পাশে থাকতে? আমার জীবনের শেষ দিনগুলো তোমার সাথে কাটাতে পারব, এই আশায় বুক বাঁধতে পারি?”

অনন্যা সুশান্ত বাবুর চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো কামনা ছিল না, ছিল কেবল ভালোবাসা আর নির্ভরতা। অনন্যা মৃদু হেসে বলল, “আমি আপনার পাশে সবসময় থাকব, সুশান্ত দা। বয়স কোনো বাধা নয়। মনটাই আসল।”

সেই দিন থেকে তাদের সম্পর্কটা এক নতুন মোড় নিল। গ্রামের লোকেরাও ধীরে ধীরে তাদের এই সম্পর্ককে মেনে নিল। অনন্যা আর সুশান্ত বাবু মিলে গ্রামের একটি ছোট স্কুলকে নতুন করে সাজালেন। অনন্যা পড়াত, আর সুশান্ত বাবু দেখাশোনা করতেন। তাদের ভালোবাসার আলোয় গ্রামের অনেক সুবিধা বঞ্চিত শিশু নতুন করে আলোর দিশা পেল।

শেষ বিকেলের আলো যেমন দিনের শেষে নতুন ভোরের আশা জাগায়, তেমনি অনন্যা আর সুশান্ত বাবুর অসমবয়সী ভালোবাসা এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাল। তারা প্রমাণ করল, ভালোবাসা কোনো বয়স, সমাজ বা নিয়মের বেড়াজালে বাঁধা থাকে না, তা কেবলই আত্মার মিলন।

মন্তব্য করুন