আলোর রেখা
আলোর রেখা। নামটা ওর মায়ের দেওয়া। কারণ, জন্মের সময় নাকি ওর চোখ দুটো এমন উজ্জ্বল ছিল, যেন একফোঁটা আলো। গ্রামের সাধারণ মেয়ে আলো। বাবা দিনমজুর, মা গৃহবধূ। আট ভাইবোনের মধ্যে আলো সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই ওর অন্যরকম স্বপ্ন। গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ের মতো শুধু বিয়ে করে সংসারী হওয়া নয়, ওর ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করার, আরও বড় কিছু হওয়ার। কিন্তু গ্রামের রক্ষণশীল সমাজ আর অভাবের সংসারে মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে কে ভাবে!
আলোর বাবা-মা অনেক কষ্ট করে ওকে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। সেখানে ভালো ফল করল আলো। কিন্তু মাধ্যমিকের পর আর পড়ার সুযোগ পেল না। ততদিনে ওর বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাইগুলো বাবার সাথে কাজে লেগেছে। আলোকেও সংসারের কাজে সাহায্য করতে হত। কিন্তু ওর ভেতরের জেদটা মরেনি। রাতের বেলা যখন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন টিমটিমে হারিকেনের আলোয় ও পুরনো বই নিয়ে বসত। গ্রামের স্কুল মাস্টারের কাছ থেকে চেয়ে আনা বইগুলো ছিল ওর জগৎ।
একদিন, পাশের গ্রামের এক স্কুল শিক্ষিকা, রিনা আপা, এলেন তাদের বাড়িতে। তিনি আলোর পড়াশোনার কথা শুনে খুব অবাক হলেন। মেয়েটার মেধা আর আগ্রহ দেখে তিনি ওকে পাশে গ্রামের হাইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তবে শর্ত ছিল, আলো নিজের খরচ নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে। রিনা আপার এই উদারতা আলোর জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।
আলো এবার আরও বেশি করে পড়াশোনার সুযোগ পেল। দিনের বেলা সে গ্রামের মহিলাদের সেলাই শেখাত, আর সন্ধ্যায় নিজের পড়াশোনা করত। সেলাইয়ের কাজ করে যে সামান্য টাকা পেত, তা দিয়ে নিজের পড়ার খরচ, যাতায়াতের খরচ মেটাত। ওর জীবনটা ছিল এক নিরন্তর সংগ্রাম। কিন্তু হার না মানা মানসিকতা ওকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে আলো এবার কলেজে ভর্তি হলো। গ্রামের মানুষেরা অনেকেই ওকে নিয়ে আলোচনা করত। ‘মেয়ে মানুষের এত পড়াশোনা কেন?’ ‘এত শিখে কী করবে?’ এসব কথা ওর কানে আসত, কিন্তু ও এসবে কান দিত না। ওর লক্ষ্য ছিল স্থির। সে ঠিক করল, বড় হয়ে সে গ্রামের মেয়েদের জন্য কিছু করবে। ওদের শিক্ষিত করে তুলবে, যাতে ওদেরও স্বপ্ন দেখার সাহস জন্মায়।
কলেজের পর আলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। সেখানে সে শিক্ষকতার উপর পড়াশোনা শুরু করল। এই সময় রিনা আপা ওকে গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষিকার চাকরি পেতে সাহায্য করলেন। আলো একদিকে পড়াশোনা করত, অন্যদিকে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াত। ওর পড়ানোর ধরনটা ছিল খুব সুন্দর। খেলার ছলে, গানের মাধ্যমে ও ওদের শেখাত। ওর ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা খুব আনন্দ পেত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে আলো গ্রামে ফিরে এল। গ্রামের মানুষেরা ওকে নিয়ে গর্বিত। যে মেয়েটাকে একসময় তারা অবহেলা করত, আজ সে গ্রামের গর্ব। আলো গ্রামের স্কুলটিতে স্থায়ী শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিল। শুধু তাই নয়, সে গ্রামের মেয়েদের জন্য একটি সন্ধ্যায় পাঠশালাও চালু করল। যেখানে তারা শুধু পড়াশোনাই নয়, সেলাই, হাতের কাজ, এবং জীবনের নানা প্রয়োজনীয় বিষয় শিখতে পারত।
আলোর হাত ধরে গ্রামের অনেক মেয়েই আজ শিক্ষিত। তারা আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। তাদের চোখেও আজ স্বপ্ন। আলোর জীবনটা সত্যিই এক আলোর রেখা হয়ে উঠেছিল। সে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছে, আর সেই সাথে অন্যদের জীবনেও আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। ওর গল্পটা গ্রামের প্রতিটি মেয়ের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা।

