A woman guides young girls in sewing craft inside a rustic wooden shed, portraying a rural lifestyle.

আলোর রেখা

লাভ স্টোরি

রুবিদের ছোট্ট গ্রামটির নাম শান্তিপুর। বাঁশঝাড়, আম্রকুঞ্জ আর সবুজে ঘেরা শান্তিপুর। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল দারিদ্র্যের এক রুক্ষ চিত্র। রুবির পরিবারও সেই চিত্রেরই অংশ। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খান তারা। এমন পরিবেশে রুবির বড় হওয়া, যেখানে স্বপ্ন দেখাটাই ছিল বিলাসিতা।

কিন্তু রুবির চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন। সে স্বপ্ন দেখত, একদিন সেও বড় হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তার এই স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় সহায় ছিল তার ভালোবাসার মানুষ, সজীব। সজীব শান্তিপুরেরই ছেলে, কিন্তু সে শহরে পড়াশোনা করে। গ্রামের সাধারণ মেয়ে রুবির এমন স্বপ্ন দেখার সাহস তাকে মুগ্ধ করত। সজীব প্রায়ই রুবিকে বলত, ‘তোমার ভেতরের আলোটা অনেক বড়, রুবি। এই আলোয় তুমি একদিন অনেক দূর যাবে।’

গ্রামের অনেকেই রুবির স্বপ্নকে হাসির খোরাক বানাত। ‘মেয়ে মানুষ, এত লেখাপড়া করে কী হবে?’ – এমন কথা প্রায়ই কানে আসত। কিন্তু সজীবের কথায় রুবি সাহস পেত। সে লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়ত, রাতের বেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন হারিকিনের আলোয় সে পড়ত। সজীব শহর থেকে তার পুরনো বইগুলো এনে দিত।

একদিন সজীব এসে রুবিকে বলল, ‘শহরে একটা সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে। তুমি সেখানে ভর্তি হতে পারো। সেলাই শিখে তুমি নিজের একটা রোজগারের পথ তৈরি করতে পারবে।’ রুবির মনে আশা জাগল। কিন্তু এত টাকা সে পাবে কোথায়? তার বাবা-মা রাজি হবেন কি?

সজীব তার সবটুকু সঞ্চয় রুবিকে দিল। বলল, ‘এটা দিয়ে তুমি ভর্তি হয়ে যাও। বাকিটা আমি দেখছি।’ রুবির চোখ জলে ভরে এল। এমন বন্ধু, এমন ভালোবাসার মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সে সজীবের হাত ধরে বলল, ‘আমি তোমাকে নিরাশ করব না, সজীব।’

রুবি শহরে গিয়ে সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হল। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হত। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। কিন্তু সে হাল ছাড়ল না। তার হাতের কাজ খুব দ্রুত উন্নতি করতে লাগল। প্রশিক্ষকরাও তার কাজে মুগ্ধ হলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই রুবি সেরা ছাত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পেল।

প্রশিক্ষণ শেষে রুবি গ্রামে ফিরে এল। সজীবের দেওয়া টাকা দিয়ে সে একটা পুরনো সেলাই মেশিন কিনল। গ্রামের মেয়েদের নিয়ে সে একটা ছোট দল তৈরি করল। তাদের সেলাই শেখাতে লাগল। পাশাপাশি, সে নিজের জন্য অর্ডার নিতে শুরু করল। গ্রামের সাধারণ জামাকাপড় থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে সে শাড়ির পাড় বসানো, নকশা করা জামা তৈরি করতে লাগল।

ধীরে ধীরে রুবির সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। পাশের গ্রাম থেকেও মহিলারা তার কাছে আসতে লাগল। সজীবের দেওয়া সেই ছোট্ট অনুপ্রেরণার আলো আজ এক মশাল হয়ে জ্বলে উঠল। রুবি এখন গ্রামের অনেক মেয়ের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখায়। তার নিজের একটি ছোট বুটিকও খুলেছে।

একদিন সজীব রুবিকে দেখতে এল। রুবি তখন তার বুটিকে বসে নতুন নকশার কাজ করছে। সজীব এসে দাঁড়াল দরজায়। রুবি মুখ তুলে সজীবকে দেখে হেসে ফেলল। সজীব বলল, ‘বলেছিলাম না, তোমার ভেতরের আলোয় তুমি একদিন অনেক দূর যাবে। আজ তুমি শুধু নিজে আলো ছড়াচ্ছ না, আরও অনেককে আলোকিত করছ।’

রুবি সজীবের হাত ধরে বলল, ‘তোমার ভালোবাসা আর বিশ্বাস আমাকে এই পথ দেখিয়েছে। তুমি পাশে না থাকলে হয়তো আমি কোনোদিনই এই স্বপ্ন দেখতে পারতাম না।’

শান্তিপুরের রুবি আজ আর শুধু এক সাধারণ মেয়ে নয়। সে এক অনুপ্রেরণা। তার গল্প বলে, ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।

মন্তব্য করুন