A group of athletes running on a curved outdoor track in a competitive race.

বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের চমক! নতুন তারার জন্ম?

খেলাধুলা






বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের চমক! নতুন তারার জন্ম?


বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের চমক! নতুন তারার জন্ম?

আজ, ৬ অক্টোবর ২০২৬ – ভাবুন তো, বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেট বিশ্ব মঞ্চে দৌড়ের ট্র্যাকে শুধু অংশই নিচ্ছেন না, বরং দাপটের সাথে পদকের লড়াইয়ে আছেন! শুনতে রূপকথার মতো লাগছে? কিন্তু এই মুহূর্তে, বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের আকাশে এমন এক সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে, যা আমাদের এই স্বপ্নকে আরও বেশি বাস্তব করে তুলছে। গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে এই বছর, কিছু তরুণ প্রতিভার উত্থান এমনভাবে হয়েছে যে, তা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের নাম নতুন করে উচ্চারিত করছে।

কে এই অদেখা বাঘ?

আমরা যারা অ্যাথলেটিকসকে শুধু অলিম্পিক বা বড় আন্তর্জাতিক আসরের সময় মনে রাখি, তাদের কাছে এই নামগুলো হয়তো এখনও নতুন। কিন্তু যারা নিয়মিত ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন যে কিছু নাম নীরবে, নিভৃতে নিজেদের তৈরি করে চলেছেন। ভাবুন তো, আমরা যখন উসাইন বোল্টের পায়ের ছাপ দেখে অবাক হতাম, তখন আমাদের দেশেও এমন কেউ তৈরি হচ্ছে, যার পায়ের ছাপ একদিন বিশ্ব কাঁপাতে পারে! এই মুহূর্তে, যে তরুণ তুর্কিদের নিয়ে কথা হচ্ছে, তাদের নামগুলো হয়তো এখনও সেভাবে উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু তাদের পারফরম্যান্স বলছে অন্য কথা।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হওয়া এশিয়ান ইয়ুথ অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে, আমাদের দেশের এক তরুণ স্প্রিন্টার কেবল ফাইনালেই ওঠেনি, তাক লাগিয়ে দিয়েছে পুরো মহাদেশের ক্রীড়া বোদ্ধাদের। তার টাইমিং এমন যে, তা অনেক প্রতিষ্ঠিত এশিয়ান অ্যাথলেটকেও ভাবনায় ফেলেছে। শুধু দৌড় নয়, হ্যামার থ্রো, লং জাম্পের মতো ইভেন্টেও বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীরা তাদের ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স ছাড়িয়ে যাচ্ছে একের পর এক। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল বলেই মনে হচ্ছে।

সেই রাত, যখন সবকিছু বদলে গেল

আমার মনে আছে, মাস তিনেক আগের কথা। দক্ষিণ এশিয়ার এক ছোট টুর্নামেন্ট চলছিল। বাংলাদেশের দল সেখানে গিয়েছিল মূলত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কিন্তু ফাইনালে যখন ছেলেটির নাম ঘোষণা করা হলো, তখন দর্শকরা কিছুটা অবাকই হয়েছিল। অথচ, সে যেভাবে দৌড় শুরু করলো, তা ছিল দেখার মতো। প্রথম পঞ্চাশ মিটার হয়তো একটু ধীর ছিল, কিন্তু পরের পঞ্চাশ মিটারে সে এমনভাবে গতি বাড়ালো যে, সবাই বিশ্বাসই করতে পারছিল না। লাইনে যখন প্রথম হলো, তখন ধারাভাষ্যকারদের বিস্ময়মাখা কণ্ঠস্বর এখনও আমার কানে বাজে। সেবার হয়তো বড় কোনো পদক জেতেনি, কিন্তু তার দৌড়ের ধরণ, তার আত্মবিশ্বাস, তার প্রতিপক্ষের উপর আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা — এগুলোই বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই ছেলে একদিন অনেক দূর যাবে।

এমন ঘটনা শুধু একজন নয়, আরও কিছু তরুণ প্রতিভার ক্ষেত্রেও ঘটছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই ছেলেমেয়েরা, যারা হয়তো বড় কোনো সুযোগ-সুবিধার আলো দেখেনি, তারাও তাদের অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করছে। তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ, উন্নত মানের সরঞ্জাম — এসব হয়তো এখনও সীমিত, কিন্তু তাদের ভেতরের আগুনটা নেভেনি।

‘আমরাও পারি’ মন্ত্রের জয়গান

বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশ মানেই যেন কিছু নির্দিষ্ট ইভেন্টের কিছু পরিচিত মুখ। কিন্তু এই নতুন প্রজন্মের আগমনে সেই ধারণাই পাল্টে যাচ্ছে। তারা শুধু অংশ নিচ্ছেন না, তারা লড়াই করছেন। তারা দেখছেন, কীভাবে সেরাদের সাথে পাল্লা দিতে হয়। এই মানসিকতাটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এতদিন ধরে আমরা হয়তো ‘আমরাও পারি’ মন্ত্রটা শুধু মুখে বলতাম, কিন্তু এই ছেলেমেয়েরা এখন মাঠে তা প্রমাণ করছে।

ভাবুন তো, জ্যামাইকার মতো ছোট দেশ থেকে কীভাবে বিশ্বসেরা স্প্রিন্টার তৈরি হয়? তাদের জাতীয় পর্যায়ে অ্যাথলেটিকসের যে পরিকাঠামো, যে সমর্থন—তা আমাদের চেয়ে হয়তো অনেক বেশি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা পারবো না। আমাদের আছে অনেক বেশি জনসংখ্যা, অনেক বেশি সম্ভাবনা। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিচর্যা আর সুযোগ। এই নতুন তারকারা সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই আছে।

একটা উদাহরণ ভাবুন

ধরুন, আপনার বাড়িতে একটি ছোট্ট চারাগাছ আছে। আপনি যদি শুধু পানি দেন, কিন্তু সার বা আলো না দেন, তবে গাছটি হয়তো বাঁচবে, কিন্তু বড় হবে না। কিন্তু যদি আপনি সঠিক সার, আলো, বাতাস—সবকিছু নিশ্চিত করেন, তবে সেই চারাগাছটিই একদিন বিশাল মহীরুহ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের এই তরুণ অ্যাথলেটরা হচ্ছে সেই চারাগাছ। তাদের মধ্যে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তাদের বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন আমাদের সঠিক পরিচর্যা, উন্নত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা, এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাদের উপর বিশ্বাস।

সম্প্রতি, একজন লং জাম্পার এক প্রতিযোগিতায় নিজের আগের রেকর্ড প্রায় এক মিটার ছাড়িয়ে গেছে। যে কোনো ক্রীড়া বিশেষজ্ঞই বুঝবেন, এক মিটারে উন্নতি করাটা কতটা কঠিন, বিশেষ করে যখন আপনি ইতিমধ্যেই ভালো করছেন। এই যে এত বড় লাফ, এটা শুধু শারীরিক শক্তির নয়, এটা মানসিক দৃঢ়তারও পরিচায়ক। সে হয়তো ভেবেছিল, ‘আজ আমি আমার সেরাটা দেবো’, আর সেটাই তাকে এই অভূতপূর্ব অর্জনে সাহায্য করেছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্নে রঙিন

এই যে নতুন প্রজন্মের আগমন, এটা কি বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা? আমরা কি এবার শুধু দর্শক হয়ে থাকবো না, বরং আমরাও পদকের মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেব? এই প্রশ্নগুলো এখন আমাদের মনে উঁকি দিচ্ছে। আমাদের অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, ফেডারেশন, সরকার — সকলেরই এখন এই প্রতিভাদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। এদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া, এবং তাদের মানসিক বিকাশের জন্য কাজ করা—এগুলোই হতে পারে আগামী দিনের সাফল্যের চাবিকাঠি।

যদি এই তরুণরা তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, এবং তাদের পাশে আমরা শক্তভাবে দাঁড়াই, তাহলে আগামী অলিম্পিক বা বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখাটা আর স্বপ্ন থাকবে না, তা হয়ে উঠবে এক বাস্তব দৃশ্য। আমরা হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এমন কোনো মুহূর্তের সাক্ষী হবো, যখন কোনো বাংলাদেশী অ্যাথলেট বিশ্বসেরার খেতাব জিতবে, অথবা অলিম্পিকে পদক জিতবে।

এই তারাদের আলোয় আলোকিত হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম। কারণ, তারা শুধু একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে না, তারা হাজারো স্বপ্নকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখাচ্ছে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি লাফ, প্রতিটি দৌড় — আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, সম্ভাবনা অসীম, যদি শুধু আমরা সাহস করে এগিয়ে যাই।

– আপনার প্রথম আলো ম্যাগাজিনের ফিচার লেখক।
তারিখ: 06 October 2026


মন্তব্য করুন