অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে
প্রথম আলো ফিচার | 01 October 2026
ভাবুন তো, একটা ছোট্ট শিশু, যে কিনা পৃথিবীর কোনো শব্দই শুনতে পায় না। তার চারপাশের পৃথিবীটা কেমন? নিস্তব্ধ? নাকি অন্য কোনো ভাষায় কথা বলে?
আমার এক পরিচিতের মেয়ে, নীলা। জন্ম থেকেই সে শোনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। প্রথম প্রথম মনে হতো, ও বুঝি আমাদের এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীর অংশই নয়। কিন্তু যখন ওর ছোট্ট হাতগুলো ইশারা দিয়ে কথা বলতো, যখন ওর চোখগুলো একেকটা কথা ফুটিয়ে তুলতো, তখন বুঝলাম—নীলা তার নিজস্ব ভাষায় পুরো পৃথিবীটাকেই শুনছে। ওর কথাগুলো হয়তো আমাদের কানে পৌঁছায় না, কিন্তু ওর মনের গভীরে যে আলোড়ন, যে অনুভূতি—তা কোনো অংশেই কম নয়।
এই অদৃশ্য দেয়াল, যা অনেক সময় আমাদের একে অপরের থেকে আলাদা করে রাখে, তা শুধু শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতাই নয়, আমাদের নিজেদের তৈরি করা কিছু ধারণাও বটে। আজ আমরা সেই দেয়ালগুলোর ওপারে উঁকি দেবো, যেখানে অপেক্ষা করছে নতুন এক পৃথিবী।
যখন শব্দগুলো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়
আমাদের জীবনে শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা কথা বলি, শুনি, গান গাই, গল্প করি—এই সবই শব্দের মাধ্যমে। কিন্তু যখন এই শব্দগুলো শোনার ক্ষমতা থাকে না, তখন এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়।
নীলার মতো যারা জন্মান্ধ, তাদের জন্য পৃথিবীটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ভাষা হলো ইশারা, তাদের গান হলো চোখের ভাষা, তাদের গল্প হলো মুখের অভিব্যক্তি।
ধরুন, আপনি একটি জনাকীর্ণ বাজারে দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে মানুষের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ফেরিওয়ালার হাঁক। আপনার কানে যদি এই সব শব্দ না পৌঁছাতো, তবে কেমন লাগত? আপনি হয়তো দেখতেন—মানুষগুলো হাত নাড়ছে, মুখ নাড়ছে, কিন্তু তাদের ভেতরের অনুভূতিগুলো আপনার কাছে অধরাই থেকে যেত।
কিন্তু যারা এই পৃথিবীতে জন্মেছেন, তারা কিন্তু এই নীরবতাকেই তাদের ভাষা বানিয়েছেন। তারা তাদের চারপাশের জগৎটাকে অন্যভাবে অনুভব করেন। স্পর্শ, গন্ধ, এবং দৃশ্যমান সংকেতের মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে এক গভীর সংযোগ তৈরি করেন।
সম্প্রতি আমি একটি কর্মশালায় গিয়েছিলাম, যেখানে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিল্পীরা তাদের কাজ প্রদর্শন করছিলেন। তাদের আঁকা ছবি, হাতে গড়া ভাস্কর্য—প্রতিটি কাজেই ছিল গভীর আবেগ ও চিন্তার ছাপ। তারা তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে এমন সব কথা বলেছেন, যা হয়তো হাজারো শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
আমরা প্রায়শই মনে করি, “ওরা তো শুনতে পায় না, ওদের জীবনটা অনেক কষ্টের।” এই ভাবনাটাই কিন্তু একটা দেয়াল। আমরা বোঝার চেষ্টা করি না যে, তাদের নিজস্ব এক জগৎ আছে, নিজস্ব এক আনন্দ আছে, নিজস্ব এক যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে।
অন্য চোখে দেখা, অন্য মনে বোঝা
শুধু শ্রবণ প্রতিবন্ধী নয়, আমাদের সমাজে আরও অনেক মানুষ আছেন যাদের হয়তো আমরা “স্বাভাবিক” বলে মনে করি না। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, বা যারা ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে জন্মান—তাদের সবারই নিজস্ব কিছু বাস্তবতা আছে।
আমার এক বন্ধু, রফিক, ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনায় তার একটি পা হারান। প্রথম দিকে সে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিল। মনে হতো, জীবনের সব পথ বুঝি বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তারপর সে আবার ঘুরে দাঁড়ালো। সে হুইলচেয়ার ব্যবহার করে, কিন্তু তাতে তার জীবন থেমে থাকেনি। সে এখন একজন সফল ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার।
রফিক আমাকে প্রায়ই বলে, “জানিস, পা নেই তাতে কী! আমি তো আমার দুই হাত দিয়ে এই জগৎটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি, এই পৃথিবীতে নিজের ছাপ রেখে যেতে পারি।”
এই যে “স্বাভাবিক” বনাম “অস্বাভাবিক” বিভাজন—এটা কিন্তু আমরাই তৈরি করি। আমরা হয়তো ভাবি, যারা আমাদের মতো নয়, তারা আমাদের সমাজের অংশ নয়। কিন্তু সত্যি কি তাই?
একবার একটি পার্কে বসেছিলাম। দেখলাম, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা একা হেঁটে আসছেন। তার হাতে একটি লাঠি, আর তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি হয়তো চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু তিনি নিশ্চয়ই বাতাসের স্পর্শ, ফুলের গন্ধ, বা মাটির সোঁদা গন্ধ অনুভব করছেন। তার অনুভূতিগুলো হয়তো আমাদের চেয়ে ভিন্ন, কিন্তু কম নয়।
আমাদের এই “স্বাভাবিক” জগতের তৈরি করা নিয়মকানুন, প্রত্যাশা—এগুলোই অনেক সময় অন্যদের জন্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যদি একটু খোলা মন নিয়ে দেখি, তাহলে বুঝব, এই দেয়ালগুলো আসলে আমাদের নিজেদের মনের ভেতরই বেশি।
একই আকাশে নতুন চাঁদ
অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সহানুভূতি এবং বোঝাপড়া। যখন আমরা অন্যের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখতে শিখি, তখন দেয়ালগুলো এমনিতেই গুঁড়িয়ে যেতে শুরু করে।
আজকাল অনেক জায়গায় “ইনক্লুসিভ” বা অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এর মানে হলো—এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, কেউ বাদ পড়বে না।
যেমন, অনেক স্কুল এখন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করছে। সিনেমা হলগুলোতে সাধারণ ছবির পাশাপাশি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার (ইশারা ভাষায় অনুবাদক) ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভাবুন তো, যদি আমাদের চারপাশের সব জায়গায় এই ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তন আনা যায়?
- যদি আমরা রাস্তায় চলার সময় বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য র্যাম্প (ঢালু পথ) তৈরি করি?
- যদি আমরা অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে এমন পরিবেশ তৈরি করি যেখানে সবাই নিজেদের মূল্যবান মনে করে?
- যদি আমরা যখন কারো সাথে কথা বলি, তখন তাদের কথা মন দিয়ে শুনি—তা তারা ইশারায় বলুক বা অন্য কোনোভাবে?
এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই কিন্তু বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আমি সম্প্রতি একটি ডকুমেন্টারি দেখছিলাম, যেখানে একটি দল নানা রকম প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও একসাথে একটি সমুদ্র সৈকতে পৌঁছেছে। তাদের যাত্রাটা সহজ ছিল না। অনেক বাধা ছিল, অনেক প্রতিকূলতা ছিল। কিন্তু তারা একে অপরের পাশে ছিল। তারা একে অপরের শক্তি ছিল।
তাদের চোখে মুখে ছিল আনন্দ, বিজয়ের হাসি। তারা প্রমাণ করেছে, দেয়াল যত বড়ই হোক না কেন, মানুষের ইচ্ছাশক্তি আর সম্মিলিত প্রচেষ্টা তাকে অতিক্রম করতেই পারে।
আসলে, আমরা সবাই একই আকাশের নিচে বাস করি, একই সূর্যের আলো পাই। আমাদের পার্থক্যগুলো ছোট, আমাদের মিলগুলো অনেক বড়।
একদিন, নীলার সাথে বসেছিলাম। সে তখন একটি ছবি আঁকছিল। আমি ওর পাশে বসে ওর ইশারাগুলো বোঝার চেষ্টা করছিলাম। ও আমাকে কী বোঝাতে চাইছিল, তা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। কিন্তু ওর চোখে যে একরাশ আনন্দ ছিল, তা আমি অনুভব করতে পারছিলাম।
ওই মুহূর্তেই আমার মনে হলো—এই দেয়ালগুলো আসলে দূরত্বের নয়, উপলব্ধির। আর এই উপলব্ধি যদি আমরা একবার অর্জন করতে পারি, তবে আমরাও পৌঁছে যাব সেই “অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে”।
প্রতিটি মানুষই এক একটি অনন্য জগৎ। সেই জগৎগুলোকে জানার, বোঝার এবং তাদের আলোয় আলোকিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।
