A cricket fan passionately waving the Bangladesh flag outdoors under a clear sky, symbolizing national pride.

বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন ভোরের স্বপ্ন?

খেলাধুলা






বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন ভোরের স্বপ্ন?


বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন ভোরের স্বপ্ন?

মনে আছে, সেই ২০০৭ সালের কথা? যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছিল একেবারেই নতুন এক ফরম্যাট, আর বাংলাদেশ দল সেই অভিষেকেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছিল! বিশ্ব ক্রিকেট তখন অবাক চোখে দেখছিল এই লাল-সবুজ জার্সিধারীদের। সেই থেকে কত পথ পেরিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়, রোমাঞ্চকর মুহূর্তের সাক্ষী আমরা সবাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পুরোনো উন্মাদনা, সেই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন কি আজও বেঁচে আছে? নাকি আমরা কেবলই স্মৃতি রোমন্থন করছি?

ঠিক কোন পথে হাঁটছে আমাদের তারকারা?

গতকাল, ১৬ জুলাই, ২০২৬। মিরপুরের একাডেমি মাঠে অনুশীলন করছে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এক ঝাঁক তরুণ মুখ। তাদের চোখে মুখে একই স্বপ্ন, যা একদিন সাকিব, তামিম, মুশফিকদের চোখে ছিল। কিন্তু এই তরুণদের সামনে পথটা কি আগের চেয়ে মসৃণ? নাকি আরও কঠিন?

আমরা প্রায়শই বড় টুর্নামেন্টে আমাদের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশ হই। অস্ট্রেলিয়ার বা ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর ধারাবাহিকতার সামনে আমরা পিছিয়ে পড়ি। কিন্তু কেন? এর পেছনের কারণগুলো কি শুধু খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের অভাব? নাকি আরও গভীর কিছু?

মনে করুন, ভারতের কথা। তারা শুধু একটি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ঘরোয়া লিগ, কাউন্টি ক্রিকেট, একাডেমী — সবকিছুর মধ্যে একটা সুসংগঠিত কাঠামো কাজ করে। আমাদের দেশেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) শুরু হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু এর প্রভাব কি সেই কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছেছে? অনেক তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় বিপিএলের মাধ্যমে উঠে আসছেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য যে পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?

‘বড় দল’ হওয়ার লড়াই: শুধু জয়ে আটকে থাকলে কি হবে?

আমরা যখন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা ভারতের মতো দলগুলোর কথা ভাবি, তখন তাদের শুধু বর্তমান পারফরম্যান্স নয়, তাদের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হয়। তারা বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে আসছে। তাদের শুধু তারকা খেলোয়াড়ই তৈরি হয় না, তাদের পুরো ক্রিকেট ইকোসিস্টেমটাই তৈরি। তাদের কোচিং স্টাফ, ফিজিও, ট্রেনার, এমনকি মাঠকর্মীরাও অত্যন্ত পেশাদার।

সম্প্রতি, বাংলাদেশ দল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একটি ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে। ম্যাচগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও, শেষ পর্যন্ত আমরা জয় ছিনিয়ে আনতে পারিনি। এই হারগুলো আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই হার থেকে আমরা কি শিখছি? কোচিং স্টাফদের ভূমিকা, খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতি, ফিল্ডিং — এই বিষয়গুলোতে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি একটি গাছ লাগালেন। শুধু পানি দিলেই তো হবে না, মাটি তৈরি করতে হবে, সার দিতে হবে, সঠিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ক্রিকেটেও ঠিক তাই। শুধু ভালো খেলোয়াড় তৈরি করলেই হবে না, তাদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেখানে তারা ভুল থেকে শিখবে, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেবে এবং নিজেদের উন্নতিতে মনোযোগ দেবে।

নতুন প্রজন্মের চোখে নতুন স্বপ্ন?

আমার এক তরুণ ক্রিকেট ভক্ত বন্ধু, রবি, সম্প্রতি বলছিল, “দাদা, এখনকার খেলাগুলো দেখলে মনে হয় যেন সব কিছুই আগের মতো। সেই একই সমস্যা, সেই একই হার। নতুন কী দেখছি আমরা?” রবির কথাগুলো হয়তো অনেকেরই মনের কথা। কিন্তু আমি ওকে বুঝিয়েছি, এই ‘নতুন কী’টা তৈরি করতে সময় লাগে।

এখনকার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়দের দিকে তাকান। তাদের ফিটনেস, তাদের সাহস — সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তারা নিজেদের দেশের হয়ে বিশ্ব মঞ্চে সম্মানজনক পারফরম্যান্সের স্বপ্ন দেখছে। তাদের প্রশিক্ষকরাও চেষ্টা করছেন আধুনিক ক্রিকেটের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে।

আমরা যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের কথা ভাবি, তখন শুধু তাদের কিংবদন্তী খেলোয়াড়দের নামই মনে পড়ে না, তাদের সেই সময়ের দাপট, তাদের ক্রিকেটীয় দর্শনও মনে পড়ে। আমরা কি সেই পথে হাঁটতে পারি? আমাদের নিজস্ব ক্রিকেটীয় দর্শন তৈরি করতে পারি?

বিপিএল কি সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিচ্ছে?

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) নিঃসন্দেহে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আয়োজন। এর মাধ্যমে অনেক তরুণ প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর মান আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। বিদেশী খেলোয়াড়দের আনাগোনা, টুর্নামেন্টের সময়সূচী, পিচের মান — এই সবকিছুর উপর আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।

বিপিএলকে যদি আরও শক্তিশালী করা যায়, তবে তা আমাদের জাতীয় দলের জন্য একটি শক্ত ভিত তৈরি করবে। যেমনটা আইপিএল ভারতের জন্য করেছে। সেখানে শুধু ভারতীয় নয়, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রা খেলে, যা ভারতীয় খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা বাড়ায় এবং তাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

ভবিষ্যতের মেঘ বা নতুন আলোর রেখা?

আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি, বাংলাদেশ কি কখনো অস্ট্রেলিয়ার মতো ‘পাওয়ার হাউস’ হতে পারবে? উত্তরটা হয়তো ‘না’। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারব না। আমাদের শক্তি, আমাদের ধরণ — সবকিছু ভিন্ন।

সম্প্রতি, কিছু তরুণ খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। তাদের আত্মবিশ্বাস, তাদের আগ্রাসী মানসিকতা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। তাদের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সাকিব, হয়তো লুকিয়ে আছে নতুন কোনো তারকা।

একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। গত বছর, একটি স্কুল টুর্নামেন্টে, একটি দল মাত্র ৩০ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের অধিনায়ক হাল ছাড়েনি। পরের ম্যাচে তারা এমনভাবে ঘুরে দাঁড়ালো যে, প্রতিপক্ষ দল হতবাক হয়ে গেল। এই মানসিকতাই দরকার। হার না মানা মানসিকতা।

আমরা হয়তো এখনো বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে পারিনি, কিন্তু আমরা সেই দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের সমর্থকরা, আমাদের দেশ, আমাদের খেলোয়াড়রা— সবাই মিলে এই স্বপ্ন দেখতে পারি। আজকের নতুন ভোরের আলো হয়তো কালকের উজ্জ্বল সূর্য হয়ে উঠবে। আমাদের শুধু ধৈর্য ধরতে হবে, নিজেদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে। এই মাটিতেই হয়তো একদিন বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস লেখা হবে, আর তার নেতৃত্ব দেবে আমাদেরই তরুণ প্রজন্ম।


মন্তব্য করুন